'গুরুতর অসুস্থ ও সংকটাপন্ন' খালেদা জিয়া, দেশে আসা প্রসঙ্গে যা বললেন তারেক রহমান

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন, ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১১:৪০ পূর্বাহ্ন, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে 'সংকটাপন্ন' অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। নতুন করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত রোববার থেকে তিনি হাসপাতালেই আছেন। শনিবার সকালে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও তারেক রহমানের ফেরা প্রসঙ্গে প্রথমে বিএনপি একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এর কিছু পরে অনেকটা একই ভাষায় এই প্রসঙ্গে নিজের ফেসবুক ভেরিফায়েড পাতায় একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তারেক রহমান।

সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন। বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়েও কিছু মন্তব্য করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: মায়ের সংকটাপন্ন অবস্থায় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে যা বললেন তারেক রহমান

এতে বলা হয়েছে, মমতাময়ী জন্মদাত্রীর শয্যাপাশে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও জনাব তারেক রহমানের মন সার্বক্ষণিক ভাবে রয়েছে মায়ের পাশে। উদ্বিগ্ন মনে মায়ের অবস্থার উন্নতি অবনতির প্রতিটি মুহূর্তের সাথে রয়েছে তাঁর নিবিড় সংশ্লিষ্টতা। মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাঁর রয়েছে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ।

তারেক রহমান লিখেছেন, "এমন সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্খা যে কোন সন্তানের মত আমারও আছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মত সেটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত নয়। স্পর্শকাতর সেই বিষয় বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত।

আরও পড়ুন: খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে গেছেন এনসিপি নেতারা

তারেক রহমান আরো লিখেছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতার সেই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী"।

এর আগে রোববার হাসপাতালে নেয়ার পর একই সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসে ইনফেকশন বা সংক্রমণের কথা জানিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন। বিএনপি থেকে শুক্রবার গভীর রাতেই জানানো হয়েছে যে, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালের সিসিইউতে রেখে দেশি বিদেশি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু শুক্রবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিসেস জিয়ার অবস্থা 'সংকটময়' জানানোর পর থেকেই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে 'উৎকণ্ঠা' তৈরি হয়েছে। তাদের অনেককেই গভীর রাত পর্যন্ত হাসপাতালের সামনে দেখা গেছে।

জুমার নামাজ শেষে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে অংশ নেয়ার পর মি. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "গত দুদিন ধরে তিনি আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে চিকিৎসকরা বলেছেন তার অবস্থা সংকটময়"।

মূলত এরপর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে দলের সর্বস্তরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমেও তার সবশেষ অবস্থা নিয়ে নানা গুঞ্জন দেখা যায়।

তবে দলের পক্ষ থেকে তার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশবাসীর মাধ্যমে মহান আল্লাহ দরবারে দোয়া চেয়েছেন যেন তিনি দ্রুত আরোগ্যলাভ করেন। মেডিকেল বোর্ড-এর তত্ত্বাবধানে সিসিইউ-তে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা হচ্ছে"।

খালেদা জিয়ার সবশেষ পরিস্থিতি জানতে ও তাকে দেখতে শুক্রবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মি. আলমগীর সহ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের হাসপাতালে আসা যাওয়া করতে দেখা গেছে।খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের খোঁজ নিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

রাতে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, "এ মুহূর্তে উনি স্টেবল নন। উনি আমাদের চিনতে পেরেছেন। আমরা সালাম দিয়েছি এবং রিপ্লাইও দিয়েছেন। আমার আবেদন থাকবে সারাদেশের মানুষ যেন ম্যাডামের জন্য দোয়া করেন"।

এর আগে শুক্রবার জুমার নামাজের পরেই চিকিৎসকদের উদ্ধৃত করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে খালেদা জিয়ার অবস্থা 'সংকটময়'। মি. আলমগীর শুক্রবার বিকেলে ও পরে রাতে আবার হাসপাতালে গিয়ে দীর্ঘসময় অবস্থান করেছেন।

বিকেলে ও রাতে তার সাথে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, আব্দুল মঈন খান, সেলিমা রহমান ও বরকত উল্লাহ ভুলুসহ স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির বেশ কিছু নেতা উপস্থিত ছিলেন।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ ভুলু সাংবাদিকদের বলেছেন, "খালেদা জিয়া জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন। তবে চিকিৎসক যা বললেন তাতে আগের দিনের চেয়ে একটু ভালো অবস্থায় আছেন। সবাই দোয়া করবেন তিনি যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারেন"।

প্রসঙ্গত, শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত রোববার জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়া হয়েছিলো খালেদা জিয়াকে।

এর আগে একুশে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রওনা দিয়ে গাড়িতে ওঠেই অস্বস্তি বোধ করছিলেন তিনি। বহু বছর ধরেই তিনি লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস এবং চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।

ঢাকায় নিজের বাসায় থাকা অবস্থাতেই ২০২১ সালের মে মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। তখনো শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।

এরপর ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিলো।

এর আগে থেকেই তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একটা রিংও পরানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে পোর্টো সিস্টেমেটিক অ্যানেসটোমেসির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার লিভারের চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে।

আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলো আদালত, তারপর থেকে প্রথমে কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। দুর্নীতির আরেকটি মামলাতেও তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পরে হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই নির্বাহী আদেশে বিশেষ শর্তে মুক্তির পর তিনি গুলশানের বাসায় উঠেন। ২০২৪ সালে অগাস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ই অগাস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাকে সব দন্ড থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয়। সূত্র: বিবিসি বাংলা