২০২৭ সালের এপ্রিলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৪.৫ শতাংশ

বাজেট ইতিবাচক; ধীরে হলেও চলতি অর্থবছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে: এডিবি’র পূর্বাভাস

Sanchoy Biswas
এম মনিরুল আলম
প্রকাশিত: ৭:১৯ অপরাহ্ন, ০৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৭:১৯ অপরাহ্ন, ০৯ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি বিগত কয়েকবছরের চলমান স্থবিরতা থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। তবে অর্থনীতির এই পুনরুদ্ধারের গতি হবে ধীর। চলতি অর্থবছরে সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় থাক উদ্যোগসমূহ যেমন ব্যবসা পরিচালনার নিয়মকানুন সহজ করা, সুশাসনের প্রতিশ্রুতি এবং কর ব্যবস্থায় সংস্কার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গত জুনে রপ্তানি আয়ে ঘুরে দাঁড়ানো ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অর্থনীতিতে শক্তিশালী ভিত্তি দিতে পারে। এদিকে, চলতি মাস জুলাইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। তবে, বাজেটে নেয়া পদক্ষেপসমুহ যথার্থ বাস্তবায়ন ও ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচকগুলো অব্যাহত থাকলে আগামী বছর এপ্রিল নাগাদ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসবে বলে জানিয়েছে এডিবি। 

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এডিবি প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও), জুলাই ২০২৬ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল (২০২৭) নাগাদ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৫ শতাংশ। এডিবি’র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সদ্য সমাপ্ত (২০২৫-২৬) অর্থবছরের জিডিপি’র ৩.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আগের দুই অর্থবছরের তুলনায় সামান্য বেশি, কিন্তু পূর্ববর্তী অর্থবছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। এডিবি জানায়, এবছরের জুলাইয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ভারতে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, ভূটানে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪ শতাংশ, নেপালে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, আফগানিস্তানে ২ দশমিক ৩ শতাংশ ও মালদ্বীপে সর্বনিম্ন ১ শতাংশ হয়েছে।  

আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি, তবে বাড়তি চাপ সীমিত

এডিবি বলেছে, বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং প্রতিকূল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশের কারণে গেল অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। এডিবি সতর্ক করে বলেছে, প্রবৃদ্ধির গতি খুব দ্রুত বাড়বে না। কারণ ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ঘাটতি এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

অপরদিকে, ২০২৭ সালের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে বিদ্যমান ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে নামতে পারে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে। এডিবির মতে, জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারজনিত চাপ এবং খাদ্য ও সেবা খাতে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীরে কমবে। এডিবি’র প্রতিবেদনে একটি ইনফোগ্রাফসহ বলা হয়েছে বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। চলতি মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ; অথচ একই সময়ে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৬ শতাংশ, ভারতে ৫ দশমিক দুই শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ শতাংশ, ভূটানে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৩ দমমিক ৬ শতাংশ এবং নেপালে সবচেয়ে কম ৩ দশমিক ২ শতাংশ।  

আরও পড়ুন: দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এলএনজি সরবরাহ কমেছে, গ্যাসের স্বল্পচাপের সতর্কতা

এডিবি’র বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুবাগা বলেন, কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সুশাসন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে সংস্কার জরুরি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন শুল্ক বা বিধিনিষেধ, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর অর্থনৈতিক ধীরগতি, বৈদেশিক অর্থায়নের কঠোর পরিবেশ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকিও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।

বর্তমান সরকার গত জুনের ৩০ তারিখে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ) একটি সার্বজনীন অন্তর্ভূক্তিমূলক বাজেট অনুমোদন করেছে। ওই বাজেটে বিপুল কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন বাজেট পেশকালে জাতীয় সংসদে বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১০ টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে বাজেট পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন নিশ্চিতকরন, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, সৃজনশীল অর্থনীতি বিকাশে সহায়তা, জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মেকাবেলা, পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরালো করা। 

সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে একদিকে সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমুখী, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে সরকারের একটি বড় নীতিগত অবস্থান বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, করছাড়, শিল্প সহায়তা, স্টার্টআপ তহবিল এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের মতো উদ্যোগগুলো তার সরকারের টেকসই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।

গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষয় করেছে। এমন বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন করে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। ওই বাজেটের আগের মাসে মুল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ। 

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে সাধারন নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেই তাদের দলীয় নির্বাচনী ঘোষণাপত্র অনুযায়ী একটি বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার উৎখাত হলে একটি অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। সেই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ওই বছর জুন মাসে পতিত সরকারের বাজেট নিয়েই পুরো অর্থবছর কাটিয়ে দেয়। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ব্যাপক ধস নামে। ২০২৫ সালের ২ জুন একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট দেন অর্থ উপদেষ্টা। ওই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্ত বাজেটটি বাস্তবায়নে পুরো মেয়াদ পায়নি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। ওই দুই বছর মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারন করে। সর্বশেষ, গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমে অর্ধেক অর্থাৎ ৩ দশমিক ৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।