বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কে নতুন সমীকরণের খোঁজ, তবে আস্থার সংকট কাটেনি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সম্পর্কের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। উভয় পক্ষই নিজ নিজ বিজয়ের দাবি করলেও চলমান আলোচনা মূলত আগের পরিস্থিতি পুনঃস্থাপন নয়, বরং এমন একটি নতুন সমীকরণ খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা, যেখানে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।
দুই মাসের নৌ-সংঘাতের পর ওয়াশিংটন চায় ইরান যেন হরমুজ প্রণালি পুনরায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেয়। অন্যদিকে তেহরান চায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিক। তবে উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে স্বীকার করছে না যে দীর্ঘদিনের সংঘাত তাদের নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম
বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করলেও পারস্পরিক বিশ্বাস এখনো গড়ে ওঠেনি।
বুধবার ইরান ও ওমান ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রস্তাবিত একটি বাণিজ্যিক নৌপথের ভৌগোলিক সমন্বয় চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে যৌথ বিবৃতি প্রস্তুতের কাজ চলছে।
আরও পড়ুন: উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাতের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি ইরানের
এদিকে সংবাদ সংস্থা এপি দুটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরান ও ওমানের আলোচকরা একটি খসড়া চুক্তি সম্পন্ন করেছেন, যা এখন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্যদিকে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে উপসাগরীয় অঞ্চলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার আশাবাদ ব্যক্ত করলেও শুক্রবারের মধ্যে বিস্তৃত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা এখনো ‘৫০-৫০’।
আস্থাহীন কূটনীতি
চলমান আলোচনার ভঙ্গুরতা এখন ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বুধবার ওমানে ইরানের আলোচক দলের এক সদস্য সাংবাদিকদের জানান, আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বারবার সামরিক হামলার হুমকি। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে কোনো সমঝোতায় পৌঁছালে দেশীয় বিরোধীরা এটিকে সামরিক চাপের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান হেশমতোল্লাহ ফালাহাতপিশেহ একই দিনে সতর্ক করে বলেন, বর্তমান সংঘাতবিরতি কেবল একটি সীমিত কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আলোচনা ভেঙে গেলে সংঘাত শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা অবকাঠামোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ইরানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্য আরও জোরদার হতে পারে এবং এটি তেহরানের কৌশলগত সুবিধার বদলে বড় ধরনের দায়ে পরিণত হবে।
সাময়িক বিরতি
ইরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্কে স্পষ্ট হচ্ছে যে, সরকারপন্থী কিংবা বিরোধী—কেউই বর্তমান আলোচনাকে স্থায়ী সমাধানের সূচনা হিসেবে দেখছেন না।
রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমে আলোচনাকে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং ওমানের মধ্যস্থতা এবং ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে সৃষ্ট একটি সাময়িক বিরতি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সরকারি অবস্থানেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি দর-কষাকষি বা রাজনৈতিক ছাড় দেওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে কট্টরপন্থি গোষ্ঠী, রক্ষণশীল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে এখনো গভীর সন্দেহ পোষণ করে। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি বা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নমনীয়তা দেখানো ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই আলোচনায় অগ্রগতির প্রতিটি ইঙ্গিতের পাশাপাশি প্রক্রিয়াটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তাও দেওয়া হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বর্তমান আলোচনা নতুন আস্থার ভিত্তিতে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের উচ্চমূল্য উপলব্ধির কারণে এগোচ্ছে। তবে এই বাস্তবতা দুই পক্ষের গভীর রাজনৈতিক অবিশ্বাস কাটিয়ে স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে যথেষ্ট হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল





