এবার যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি
- পরিস্থিতির উন্নতি না হলে যৌথ অভিযান
- অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের নির্দেশ আইজিপির
- প্রতিটি এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি
- আলোচিত ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে চাঁদাবাজ, দখলদার, মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাংসহ অপরাধীদের দমনে যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে অপরাধীদের দমন করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি পুলিশকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যদি পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পুলিশ, এসআরবি, আনসার, বিজিবিসহ স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে এলাকাভিত্তিক অপরাধীদের তালিকা ধরে যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় ও পুলিশের বিশ্বস্ত সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের শীর্ষ সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পুলিশের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত আকারে পুলিশের কার্যক্রম চালু করলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারেনি। উল্টো সারা দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির তৈরি হয়। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনসাধারণ স্বাভাবিক পরিস্থিতির আশা করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি, বিতর্কিত স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান দখলদারিত্ব, কিশোর অপরাধ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে চলছে। পরিস্থিতি নৈরাজ্যকর তৈরির কাছাকাছি এলেও পরবর্তীতে পুলিশ তা প্রতিরোধ করছে।
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলসহ চার জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ
সরকারের তথ্য উপদেষ্টা বর্তমান পরিস্থিতির স্বীকার করে বলেন, পুলিশ কাজ করছে; কিন্তু উন্নতি না হলে সরকার যৌথ অপারেশন করবে।
সরকারের শীর্ষ সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সার্বিকভাবে অবহিত। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের পাশাপাশি বিএনপি কার্যালয় থেকে বিশেষ টিম পাঠিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর তদন্ত করছে। একই সঙ্গে প্রতিটি আসনভিত্তিক নির্বাচনী এলাকার চাঁদাবাজ, দখলবাজ, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপপ্রয়োগকারীদের তালিকা তৈরি করেছেন। সময়মতো তালিকা অনুযায়ী অভিযান পরিচালিত হবে।
আরও পড়ুন: একনেকে ১৫ হাজার ৭১৩ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন
এদিকে আইজিপি পুলিশ সদর দপ্তরে বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি বৈঠকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি), বাংলাদেশ মো. আলী হোসেন ফকির, বিপিএম বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই, অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধীই। তিনি কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
আইজিপি মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত মাসিক (আগস্ট ২০২৬) অপরাধ পর্যালোচনা সভায় এ নির্দেশ প্রদান করেন।
অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স প্রান্তে ছিলেন ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ পুনর্ব্যক্ত করে পুলিশ প্রধান বলেন, মাদকদ্রব্য রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তিনি এক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। তিনি গুজব ও অপপ্রচার রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী রয়েছে কি না, তা উদঘাটন করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিটি ইউনিটকে নিজ নিজ নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পূজাকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার হতে পারে। এ বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তিনি দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের যথাযথভাবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশ দেন।
মো. সায়েদুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। তিনি দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার জন্য পুলিশ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় আগস্ট, ২০২৬ মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসহ সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া, ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, পুলিশ আক্রান্ত ও অপহরণ মামলা এবং মুলতবি গ্রেফতারি পরোয়ানা, তদন্ত ও বিচারের ফলাফল, সাজার হার ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সম্প্রতি ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজ, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে হামলার ঘটনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এসব ঘটনায় নাগরিক জীবনে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। দেখা দিয়েছে নানা আশঙ্কা। কখন কার জমি বিরোধপূর্ণ দাবি করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসীরা দখলের চেষ্টা করে—এমন ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে মানুষের মনে। দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এমনটি হচ্ছে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। এসব ঘটনা সামনে রেখে সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে নজর দেওয়া হয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড ও অপতৎপরতার দিকে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও দখলদারি ও আধিপত্য বিস্তারে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহারের পুরোনো কৌশল বদলায়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পুরোনো আক্রোশ কাজে লাগিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে অপরাধের কলকাঠি নাড়ছে। গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি হামলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নাম জড়ালেও এর গভীরে রয়েছে পুরোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সহিংসতার পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তথ্য গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, সামনে জনজীবনে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা চলছে। এসব বিষয় সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। সূত্রটি জানায়, অবস্থা যেদিকে যাচ্ছে, যৌথ অভিযানের বিকল্প নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরও বলছে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। অপরাধীদের কোনো ছাড় না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
মিরপুরের বহুল আলোচিত রাড্ডা ক্লিনিকের জমি দখল নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৭৪ সাল থেকে পরিচালিত এই চ্যারিটেবল ট্রাস্টের জমিটি কাগজে-কলমে বিহারিদের হলেও তা দখলের ছক আঁকা হয়। স্থানীয় সন্ত্রাসী ও স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহল পটপরিবর্তনের সুবাদে এই সম্পত্তি কবজায় নেওয়ার পরিকল্পনা করে। ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত (২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রহর) সেখানে তাণ্ডব চালায় তারা।
অন্যদিকে দুর্ধর্ষ গ্যাং ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চারণভূমি হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অরক্ষিত। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকার একাধিক হাউজিং প্রজেক্ট, সরকারি খাসজমি এবং প্রবাসীদের বিরোধপূর্ণ জমি দখলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম বারবার সামনে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। নৈরাজ্য (এনার্কি) অবস্থা থেকে দেশ বের হয়ে আসা একটি বড় উন্নয়ন। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণেই দেশে এই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। যদি তাতে পরিস্থিতির উন্নয়ন না হয়, তাহলে আইনি কাঠামোর কোথায় যৌথ বাহিনীর অভিযান হবে, সে বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
সম্প্রতি রাড্ডা এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা না ঘটলেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সময় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রাড্ডার ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং যদি সিসিটিভি ফুটেজে কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে, এ বিষয়ে সরকার আইনি পদক্ষেপ নেবে।
তিনি বলেন, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই সরকারের কাজ।
সালমান মুক্তাদিরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তার প্রতি আমাদের সহানুভূতি রয়েছে।’





