কবি আল মাহমুদের কবিতা

বাংলাবাজার পত্রিকা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ন, ১৫ জুলাই ২০২৩ | আপডেট: ৯:৩২ পূর্বাহ্ন, ১৫ জুলাই ২০২৩
কবি আল মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত
কবি আল মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের পুরো নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি আল মাহমুদ নামিই অধিক পরিচিত। আধুনিককালে কবিদের মধ্যে যিনি জীবনবোধে, শব্দচয়নে, শব্দালংকারের নান্দনিকতায়, বর্ণনায় অসামান্য আর ধ্রুপদী, তিনি হলেন কবি আল মাহমুদ। 

আল মাহমুদ শুধু কবিই ছিলেন না, তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিকও ছিলেন। তবে কবিতাতেই আল মাহমুদ জ্বলে উঠেছিলেন বারুদের মতো। লোক লোকান্তর; কালের কলস; সোনালি কাবিন; মায়াবী পর্দা দুলে উঠো; কাবিলের বোন (উপন্যাস); পানকৌড়ির রক্ত (গল্পগ্রন্থ) তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলি। তিনি ১৯৮৬ তে একুশে পদক পান আর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান ১৯৬৮সালে। গত ১১ জুলাই ছিল কবির জন্মদিন। আসুন কবি আল মাহমুদের কয়েকটি কবিতা পড়ে নিই-

আরও পড়ুন: “শব্দ ব্যঞ্জনায় ধ্বণিময় উচ্চারণ”

একুশের কবিতা

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ

আরও পড়ুন: কবিতা- “মায়ের কোলে”

দুপুর বেলার অক্ত

বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?

বরকতের রক্ত।

হাজার যুগের সূর্যতাপে

জ্বলবে এমন লাল যে,

সেই লোহিতেই লাল হয়েছে

কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে

ছড়াও ফুলের বন্যা

বিষাদগীতি গাইছে পথে

তিতুমীরের কন্যা।

চিনতে না কি সোনার ছেলে

ক্ষুদিরামকে চিনতে ?

রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে

মুক্ত বাতাস কিনতে ?

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়

ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,

ফেব্রুয়ারির শোকের বসন

পরলো তারই ভগ্নী।

প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী

আমায় নেবে সঙ্গে,

বাংলা আমার বচন, আমি

জন্মেছি এই বঙ্গে।

-

সোনালি কাবিন-০১

সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী

যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু'টি,

আত্নবিক্র‍য়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি

আহত বিক্ষত করে চারিদিকে চতুর ভুক্র‍ুটি;

ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন,

ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি;

দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন?

আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলংকার কিনি।

বিবসন হও যদি দেখতে পাবে আমাকে সরল

পৌরুষ আবৃত করে জলপাইর পাতাও থাকবে না;

তুমি যদি খাও তবে আমাকেও দিও সেই ফল

জ্ঞানে ও অজ্ঞানে দোঁহে পরস্পর হবো চিরচেনা

পরাজিত নয় নারী, পরাজিত হয় না কবিরা;

দারুন আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।

-

সোনালি কাবিন-০২

হাত বেয়ে উঠে এসো হে পানোখী, পাটিতে আমার

এবার গোটাও ফণা কালো লেখা লিখো না হৃদয়ে;

প্র‍বল ছোবলে তুমি যতটুকু ঢালো অন্ধকার

তার চেয়েও নীল আমি অহরহ দংশনের ভয়ে।

এ কোন্ কলার ছলে ধরে আছো নীলাম্বর শাড়ি

দরবিগলিত হয়ে ছলকে যায় রাত্র‍ির বরণ,

মনে হয় ডাক দিলে সে -তিমিরে ঝাপ দিতে পারি

আচল বিছিয়ে যদি তুলে নাও আমার মরণ।

বুকের ওপরে মৃদু কম্পমান নখবিলেখনে

লিখতে কি দেবে নাম অনুজ্জ্বল উপাধিবিহীন?

শরমিন্দা হলে তুমি ক্ষান্তিহীন সজল চুম্বনে

মুছে দেবো অদ্যাক্ষর রক্তবর্ণ অনার্য প্র‍চীন।

বাঙালি কৌমের কেলি কল্লোলিত করো কলাবতী

জানতো না যা বাৎসায়ন, আর যত আর্যের যুবতী।

-

সোনালি কাবিন-০৩

ঘুরিয়ে গলার বাঁক ওঠো বুনো হংসিনী আমার

পালক উদাম করে দাও উষ্ণ অঙ্গের আরাম

নিসর্গ নমিত করে যায় দিন, পুলকের দ্বার

মুক্ত করে দিবে এই শব্দবিদে কোবিদের নাম।

কক্কার শব্দের শর আরণ্যক আত্নার আদেশ

আঠারোটি ডাক দেয় কান পেতে শোনো অষ্টাদশী,

আঙুলে লুলিত করো বন্ধবেণী, সাপিনী বিশেষ

সুনীল চাদরে এসো দুই তৃষ্ণা নগ্ন হয়ে বসি।

ক্ষুধার্ত নদীর মতো তীব্র‍ দু'টি জলের আওয়াজ--

তুলে মিশে যাই চলো অকর্ষিত উপত্যকায়,

চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাজ

উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়,

ঠোঁটের এ লাক্ষারসে সিক্ত করে নর্ম কারুকাজ

দ্র‍ুত ডুবে যাই এসো ঘূর্ণ্যমান রক্তের ধাঁরায়।

-

সোনালি কাবিন-০৪

এ তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেলো সুন্দরী

মুকুন্দরামের রক্ত মিশে আছে এ-মাটির গায়,

ছিন্ন তালপত্র‍ ধরে এসো সেই গ্র‍ন্থ পাঠ করি

কত অশ্র‍ু লেগে আছে এই জীর্ণ তালের পাতায়।

কবির কামনা হয়ে আসবে কি, হে বন্য বালিকা

অভাবে অজগর জেনো তবে আমার টোটেম

সতেজ খুনের মতো এঁকে দেবো হিঙ্গুলের টিকা

তোমার কপালে লাল, আর দীন-দরিদ্র‍ের প্র‍েম।

সে-কোন গোত্র‍ের মন্ত্র‍ে বলো বধূ তোমাকে বরণ

করে এই ঘরে তুলি? আমার তো কপিলে বিশ্বাস,

প্র‍েম কবে নিয়েছিলো ধর্ম কিংবা সংঘের স্মরণ?

মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস।

যতক্ষণ ধরো এই তাম্র‍বর্ণ অঙ্গের গড়ন

তারপর কিছু নেই, তারপর হাসে ইতিহাস।

-

আমি আর আসবো না বলে

আর আসবো না বলে দুধের ওপরে ভাসা সর

চামোচে নিংড়ে নিয়ে চেয়ে আছি। বাইরে বৃষ্টির ধোঁয়া

যেন সাদা স্বপ্নের চাদর

বিছিয়েছে পৃথিবীতে।

কেন এতো বুক দোলে? আমি আর আসবো না বলে?

যদিও কাঁপছে হাত তবু ঠিক অভ্যেসের বশে

লিখছি অসংখ্য নাম চেনাজানা

সমস্ত কিছুর।

প্রতিটি নামের শেষে, আসবো না।

পাখি, আমি আসবো না।

নদী আমি আসবো না।

নারী, আর আসবো না, বোন।

আর আসবো না বলে মিছিলের প্রথম পতাকা

তুলে নিই হাতে।

আর আসবো না বলে

সংগঠিত করে তুলি মানুষের ভিতরে মানুষ।

কথার ভেতরে কথা গেঁথে দেওয়া, কেন?

আসবো না বলেই।

বুকের মধ্যে বুক ধরে রাখা, কেন?

আর আসবো না বলেই।

আজ অতৃপ্তির পাশে বিদায়ের বিষণ্ণ রুমালে

কে তুলে অক্ষর কালো, ‘আসবো না’

সুখ, আমি আসবো না।

দুঃখ, আমি আসবো না।

প্রেম, হে কাম, হে কবিতা আমার

তোমরা কি মাইল পোস্ট না ফেরার পথের ওপর?