ঢাকার ফুটপাতে হঠাৎ হকার উচ্ছেদে বিপর্যয় কান্না

Any Akter
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩৬ অপরাহ্ন, ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩৬ অপরাহ্ন, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# নাগরিক স্বস্তির পেছনে দীর্ঘশ্বাস তিন লাখ হকারের জীবন জীবিকা।। 

# হলিডে ও সান্ধ্য মার্কেটে স্থায়ী সমাধান ও ডেটা বেইস তৈরি করে বিভাগীয় শহরে কর্মসংস্থানের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

আরও পড়ুন: আশিয়ান সিটি প্রকল্পের প্রকৃত এলাকা নির্ধারণে রাজউকের কমিটি গঠন

রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং দুই সিটি করপোরেশন সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে। গত বুধবার থেকে শুরু হয় অভিযান, তা চলে গত রবিবার পর্যন্ত। রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও সায়েন্সল্যাব এলাকার ফুটপাত ও সড়কের দখলমুক্তি ঘটেছে। তাতে অনেকটা স্বস্তি ফিরেছে জনজীবনে। তবে নাগরিক এই স্বস্তির পেছনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন প্রায় তিন লাখ হকার। তাঁদের জীবন-জীবিকা টিকে আছে এই ফুটপাত ঘিরেই। অতীতেও বহুবার উচ্ছেদ করা হয়েছে, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন না থাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই ফুটপাত ফিরে গেছে হকারদের দখলে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল উচ্ছেদই স্থায়ী সমাধান নয়, বরং হকারদের ডিজিটাল ডেটা বেইসের আওতায় এনে পরিত্যক্ত সরকারি জমিতে ‘হলিডে মার্কেট’ বা ‘স্টিল অবকাঠামো’র স্থায়ী মার্কেট নির্মাণ করে দেওয়া যায়। অন্যথায় প্রতিবছর ফুটপাত ঘিরে যে তিন হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি চলে, তা উচ্ছেদ অভিযানকে বারবার ব্যর্থতার বৃত্তে আটকে রাখবে। তবে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের (রেজি: বি-২১৫৯) সভাপতি এম এ কাশেম বলেন,হকারদের সঠিক পুনর্বাসন সবাই চায়। কিন্তু পুনর্বাসন ছাড়াই হকার উচ্ছেদ হলে এরা পরিবার নিয়ে চলবে কিভাবে? আগে আমরা দেখেছি,অনেক জায়গায় পুনর্বাসনের কথা বলা হলেও মেয়ররা এসে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার আগেই তাঁদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। হকারদের আর নিশ্চিত আয়ের পথ তৈরি হয় না। তাই আগে হকারদের পুনর্বাসন করতে হবে।

আরও পড়ুন: রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালে আগুন

অভিযান বনাম পুনর্দখল: সম্প্রতি সায়েন্সল্যাব, নিউমার্কেট, গুলিস্তান ও ফার্মগেটে উচ্ছেদ চালানো হয়। তাতে সড়ক ও ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফেরে। তবে অভিযান শেষে পুলিশ চলে যাওয়ার পরপরই হকাররা আগের জায়গায় ফিরে আসে। হকারদের দাবি, পেটের দায়েই তাঁরা বারবার ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। কথা হয় নিউমার্কেটের এক হকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের যদি বিকল্প জায়গা দেওয়া হয়, তবে রাস্তায় বসব না। যদিও বিভিন্ন সময়ের উচ্ছেদের পরের চিত্রের সঙ্গে এবার কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেছে। গুলিস্তানে বৃহস্পতিবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদের পর আগের মতো দখলবাজি হচ্ছে না। রাস্তায় নেই কোনো অস্থায়ী দোকান। ফুটপাতগুলোও অনেকটা ফাঁকা। পথচারীরা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই চলাচল করতে পারছেন। গুলিস্তান মাজার এলাকায় আগের মতো যানজট নেই। জিরো পয়েন্ট থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত মূল সড়কের দুই পাশে চলাচলকারী নাগরিকদের মুখে ছিল স্বস্তি। বেসরকারি কর্মজীবী সুলতানা হাবীব বলেন, আমার বাসা নবাবপুর, অফিস পল্টনে। অল্প পথ হলেও কখনো রিকশা ছাড়া চলাচল করতে পারিনি। এখন হেঁটে অফিসে যাচ্ছি। মানুষের ধাক্কাধাক্কি নেই, মানুষের জটলা না থাকায় ছিনতাইয়ের ভয়ও কম। অন্যদিকে ফুটপাতে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত নিজেদের অস্থায়ী দোকান না থাকায় হতাশ দোকানিরা। দোকানি সেলিম মিয়া বলেন, মাজারের কাছে আমার একটা জুতার দোকান আছিলো। এখন দোকান বহাইতে দেয় না। হুনছি আর নাকি ব্যবসায় বইতে পারমু না। কিভাবে চলমু জানি না, দেহি কী হয়।

হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ ও ব্যর্থতা: তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, অতীতে ঢাকার ফুটপাতের হকারদের পুনর্বাসন করার জন্য কিছু স্থান তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এসব স্থানের মধ্যে ছিল, ওসমানী উদ্যানের একটি অংশ, মুক্তাঙ্গন, মিরপুর মাজার রোডসংলগ্ন খালি জায়গা, যাত্রাবাড়ীর বর্তমান সবজির আড়ত, নটর ডেম কলেজ ও আইডিয়াল স্কুলের সামনের অংশ। এ ছাড়া ছিল মিরপুর-১ থেকে শাহআলী মাজার পর্যন্ত খালি জায়গা, যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার সংলগ্ন পরিত্যক্ত জমি, পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার একটি স্থান, বায়তুল মোকাররম এলাকার পূর্ব পাশে প্রায় ৩২ কাঠা সরকারি জায়গা। এসব জায়গায় মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া হকারদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেওয়ার উদ্যোগ, হকারদের বয়োবৃদ্ধ, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত তিন শ্রেণিতে ভাগ করা, বয়োবৃদ্ধ হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া, শিক্ষিত হকারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানো বা চাকরির ব্যবস্থা, আর অশিক্ষিত হকারদের নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

উচ্ছেদের পর উপায় খুঁজছে হকাররা: রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের পরপরই কেউ আবার বসে পড়ছেন। ‘ঝামেলা এড়াতে’ আগের মতো পুরোদমে দোকান না খুললেও স্বল্পপরিসরে ব্যবসা চালাচ্ছেন তারা। আবার কেউ অপেক্ষা করছেন দোকান খোলার, ভাবছেন পুলিশের ‘তোড়জোড়’ শেষ হলে কোনো ‘উপায় বের হবেই’। ঢাকার এই উচ্ছেদ অভিযান যেন চিরায়ত ‘ইঁদুর দৌড় খেলাতেই’ সীমাবদ্ধ। তবে পুলিশ বলছে, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করলেও একার পক্ষে সেই অবস্থা তাদের ধরে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য তারা সরকারের অন্যান্য সংস্থা ও সাধারণ নাগরিকের সহায়তা চান। তবে দখলমুক্ত রাখতে তারা চলমান ‘সর্বোচ্চ চেষ্টার’ পাশাপাশি ‘ফলোআপ অভিযান’ চালানোর কথাও বলেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের ১৫ দিনের মাথায় ২ মার্চ ঢাকার যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ২৪ মার্চ সচিবালয়ে ‘ঢাকা শহরের যারজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন’ শীর্ষক বিশেষ সভায় প্রধানমন্ত্রী একগুচ্ছ নির্দেশনা দেন। সেদিন সভায় সড়ক দখলমুক্ত করার সিদ্ধান্তও হয়। এর আগের দিনই পুলিশ গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে মার্চের মধ্যে ঢাকার ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেয়। অন্যথায় পহেলা এপ্রিল থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা করা হবে বলে হুঁশিয়ার করা হয়। সে অনুযায়ী পহেলা এপ্রিল বুধবার থেকে রোববার পর্যন্ত ঢাকার সবকটি বিভাগে দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদের কথা বলা হয়। এরমধ্যে শুক্রবার বাদে এই চার দিনের অভিযানে মোট ১১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায়সহ বিভিন্ন মেয়াদে জেল দেওয়া হয় ৬০ জনকে। বিশেষ এই অভিযান চলাকালীন শনিবার ঢাকার মোহাম্মদপুরের টাউনহল এলাকা থেকে বসিলা পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালায় পুলিশ। কিন্তু পরদিন মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেল বসিলামুখী সড়কের একপাশে সারি সারি ভ্যানগাড়ি। সেগুলোতে বিভিন্ন ফল, সবজির পসরা সাজিয়ে স্বাভাবিক সময়ের মতোই বিক্রি করছিলেন। এদের একজন কলা বিক্রেতা রবিউল বলেন, গত শনিবার বেলা ১১টার দিকে পুলিশ উচ্ছেদের জন্য এসেছিল। তখন পুলিশের তোড়জোড় দেখে তারা নিজেরাই ভ্যান নিয়ে চলে যান। সকালে আবার বসার পরে পুলিশ বাধা দিলে চলে যান। পরে আবার ভ্যানসহ এসে কলা বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, গরীব মানুষ আমরা, কেনাবেচা না করলে খামু কী? আর না বেঁচতে পারলে কলা পইচা যাইব। অন্যকিছু হইলে না হয় দুই দিন না আইলাম। এখন কলা পচলে পুঁজিও শেষ হইয়া যাইব। পুলিশ আবার এসে বাধা দিলে চলে যাবেন, যতক্ষণ সুযোগ পান ততক্ষণ এভাবেই ব্যবসা চালানো ছাড়া তার উপায় নেই বলে তুলে ধরেন তিনি। বাসস্ট্যান্ড মোড়েই আল্লাহ করিম মসজিদ মার্কেটের সামনে বেশ কয়েকটি চৌকি পলিথিন মোড়ানো দেখা যায়। একটি চৌকির পাশেই কাউছার নামে একজন বসে আছেন, বললেন দোকানটি তারই। পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেওয়ায় রোববার সেটি খোলেননি। তবে পাশেই মার্কেটের কিছুটা ভেতরের দিকে সারিবদ্ধভাবে আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুরসহ নানান ফল সাজিয়ে বিক্রির চেষ্টা করছেন।

কাউছার বলেন, আমরা দোকান দেওয়ার পরও ফুটপাত পুরাটা ফাঁকা, তারপরও পুলিশ আইসা আমাগো লগে ঝামেলা করে। আমরা একপাশে ওইটা সমস্যা আর রাস্তার মধ্যে দোকান বসাইয়া যে রাস্তা বন্ধ কইরা দেয় ওইটাতে সমস্যা নাই। তিনি তখন প্রধান সড়কের একপাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো দোকানগুলো দেখিয়ে দেন। এভাবে কতদিন চলবে জানতে চাইলে ফুটপাতের এই ব্যবসায়ী বলেন, আশা করি দুই-একদিনের মইধ্যেই ঠিক হইয়া যাইব। মার্কেট কমিটির লগে কথা কইছি। বাকিটা দেখা যাক। এখানে দোকান চালানোর জন্য দিনপ্রতি ২০০ টাকা মার্কেট কমিটিকে দিতে হয় বলেও জানান তিনি। ফুটপাতেই সিগারেটের প্যাকেট সাজিয়ে বসেছেন নিলুফা নামে একজন মধ্যৗ বয়সী মহিলা। তিনি বললেন, একদিন দোকান না চালাইলেই খাওয়া বন্ধ হইয়া যায়। এরমধ্যে তিন দিন ধইরা দোকান করতে পারতাছি না। এমনেই আসছি, টুকটাক যদি বেচাকেনা হয় দেখি। এই দোকান খোলা-বন্ধের ঝামেলা এবারই প্রথম নয় এই নারীর কাছে। তার ভাষ্য, প্রায়ই এভাবে উঠিয়ে দেওয়া হয়, পরে আবার ঠিক হয়। মহাখালী আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের সামনে রুবেল নামে একজন প্লাস্টিকের জিনিসপত্র, তোয়ালেসহ নানান সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন। তার বাবাও এ জায়গাতে দোকান করে আসছেন, এখন তিনি করছেন- এমন দাবি করে তিনি বলেন, কালকে পুলিশ আসছিল ওঠায়ে দিছে। মালামাল নিয়া চইলা গেছি, কী করুম? আইজকা আবার আইছি। ব্যবসা না করলে খামু কী? রুবেল বলেন, অভিযানের কথা হুইনা আগেই দোকান সরাইরা রাখছিলাম। তার মতে, এবার অভিযানে যেহেতু তাদের সরাতে পারেনি, এখন দোকান করতে আর কোন ‘সমস্যা হবে না’। তবে গুলশান ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার মিজানুর রহমান বলছিলেন, তারা মূলত স্থায়ী দোকানগুলোর তরফে ফুটপাত দখল করে রাখা অংশগুলো উচ্ছেদে কড়াকড়ি অভিযান চালিয়েছেন। আর যারা হকার বা অস্থায়ী দোকানি, তাদের সমস্যা স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা মূলত বড়লোকের দোকানগুলোর বর্ধিত অংশ যেমন, তার হোটেল আছে বাইরে কড়াইটা রেখে দিয়েছে সেগুলো মূলত লক্ষ্য করেছি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে যেখানে যেমন প্রয়োজন আইন প্রয়োগ করা হয়েছে। পুলিশের এ কর্মকর্তাও উচ্ছেদের পরই আবার দখল হয়ে যাওয়ার ‘প্রয়াসের’ কথা মেনে নিয়ে বলেন, মনিটরিং করছি, ফলোআপের প্ল্যান আছে। পরে যদি আবার এমনটি করা হয় তাহলে ডাম্পিং করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে রাজধানীতে হলিডে মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা জটিলতায় এটি মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকলেও, পরে চালুর উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় ১৬টি সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করা হয়, যার মধ্যে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি স্থানে বাজার চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলসংলগ্ন এলাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আগারগাঁওয়ে একটি হলিডে মার্কেট চালু রয়েছে। মতিঝিলের হলিডে মার্কেটে বিশেষ সময়ে ক্রেতার চাপ থাকে। ঈদ বা অন্য সময়ে রীতিমতো উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্র ও শনিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ভ্যান, ত্রিপল ও চাটাই পেতে বসে শত শত দোকান। ক্রেতারা দরদাম করে কেনাকাটার সুযোগ পান, আর বিক্রেতারাও অল্প লাভে বেশি বিক্রি করতে পারেন। ফলে উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট থাকে। উচ্ছেদের পর দোকান হারানো হকাররা মনে করেন, তাঁদের জন্য এ ধরনের মার্কেট আরো চালু করা দরকার। তাঁরা দাবি করছেন, পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে, লাইনম্যান নামধারিদের দল বিবেচনা না করে গ্রেপ্তার করতে হবে, অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে—সরকারের হকারদের জন্য নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দেওয়া ভুয়া হকার সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া; হকার পুনর্বাসনে নীতিমালা তৈরি। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হকার, পথচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বসেছি। সমাধানের জন্য কাজ করছি। প্রাথমিকভাবে মিরপুর-১০-এর ফুটপাত দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে হকার উচ্ছেদ ও তাঁদের পুনর্বাসন নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, রাজধানীতে এলোমেলোভাবে হকার বসার সুযোগ রাখা হবে না। নির্দিষ্ট কিছু জায়গা চিহ্নিত করে সেখানেই সীমিত আকারে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা সান্ধ্যকালীন মার্কেট ও হলিডে মার্কেটের পরিকল্পনা করছি। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার এই দুই দিন হলিডে মার্কেট চালুর চিন্তা রয়েছে। পাশাপাশি অফিস সময়ের পর নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সান্ধ্যকালীন বাজার বসতে পারে। প্রশাসক জানান, ঢাকা মহানগরীর সব জায়গায় এ ধরনের কার্যক্রম চালু করা হবে না। কয়েকটি নির্দিষ্ট স্পট নির্ধারণ করে শুধু সেখানেই হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে। তাঁর মতে, শুধু ঢাকায় পুনর্বাসন সম্ভব নয়। নদীভাঙনসহ নানা কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ঢাকায় আসে। তাই বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ অন্যান্য এলাকায় কাজের সুযোগ বাড়ানো গেলে ঢাকায় মানুষের চাপ কমবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ফুটপাতেই সান্ধ্যকালীন মার্কেট বসানো হবে না। বরং গুলিস্তানসহ কিছু নির্দিষ্ট জায়গা নির্বাচন করা হবে, যেখানে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। এসব স্থান চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা থেকে হকার উচ্ছেদে দীর্ঘমেয়াদি সুফলতা পেতে কেবল উচ্ছেদ না করে পরিকল্পিত পুনর্বাসন ও হকারদের তালিকাভুক্ত প্রয়োজন।  সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া উচ্ছেদ কার্যকর হয় না, যা হকারদের আবারও ফুটপাতে ফিরিয়ে আনে। তিনি বলেন, ফুটপাতে কে, কখন বসছেন তা চিহ্নিত করতে হকারদের ডেটা বেইস তৈরি করে তালিকাভুক্ত করা জরুরি, অন্যথায় হকারের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উচ্ছেদের পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে বা সময়ে (যেমন- রাতের বাজারে) পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।