চিনি-তেলের চাপে সংসার, মাছ-ডিমেও স্বস্তি নেই

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:২১ অপরাহ্ন, ২১ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৮:২১ অপরাহ্ন, ২১ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে স্বস্তি ফিরছে না। একদিকে বাড়ছে চিনি, খোলা ভোজ্যতেল ও ময়দার দাম, অন্যদিকে কমেছে বোতলজাত ভোজ্যতেলের সরবরাহ। সবজির বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অধিকাংশ সবজি এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। একই সঙ্গে ডিম, মুরগি, মাছ ও গরুর মাংসের বাড়তি দামে চাপে পড়েছে সীমিত ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। একই দিনে প্রকাশিত বাজার-সংক্রান্ত আরেকটি প্রতিবেদনে চিনি, তেল, আটা-ময়দা, সবজি, ডিম ও মুরগির দাম বাড়তি থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন: সঞ্জীবন প্রকল্প ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের আশ্বাস

বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে চিনির দাম কেজিতে বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। ফলে সামনে প্যাকেটজাত চিনির দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এক মুদি ব্যবসায়ী বলেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়ে তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৫ জনের বেতন অবনমন

তেলের বাজারেও অস্বস্তি: 

চিনির পাশাপাশি ভোজ্যতেলের বাজারেও তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম দেখা গেছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, দাম বাড়ানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোনো কোনো কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও খোলা সয়াবিন তেল ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং পাম তেল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাজারের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। মাসের শুরুতেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ-মাংস ও সবজির পেছনে বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যাওয়ায় পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

একজন মধ্যবিত্ত ক্রেতা বলেন, বাজারে কোনো একটি পণ্যের দাম বাড়লে সেটি হয়তো সামলানো যায়। কিন্তু একসঙ্গে তেল, চিনি, মাছ, ডিম ও সবজির দাম বেশি থাকলে মাসের বাজেট ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

সবজিতে কিছুটা স্বস্তি, পুরোপুরি নয়

গত সপ্তাহের তুলনায় রাজধানীর সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও তা সাধারণ মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। অধিকাংশ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে কয়েকটি সবজি এখনো ১০০ টাকার ওপরে।

বাজারে টমেটো ১৩০ টাকা, বেগুন ১২০ টাকা, শিম ২০০ টাকা, গাজর ১৪০ টাকা এবং বরবটি ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া পটল ৬০, শসা ৬০, করলা ৮০, ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ৮০, কাঁকরোল ৮০, ঢেঁড়স ৬০, পেঁপে ৪০, ধুন্দল ৬০ এবং মুলা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এক ক্রেতার ভাষ্য, সবজির দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও পুরো বাজারে স্বস্তি আসেনি। কয়েকটি সবজি এখনো ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে থাকায় পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী সবজি কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

কাঁচা মরিচে বড় স্বস্তি: 

তবে বাজারে একমাত্র বড় স্বস্তির খবর কাঁচা মরিচের দামে। ভারত থেকে আমদানির প্রভাবে রাজধানীর খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত সপ্তাহে একই পণ্য ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। কারওয়ান বাজারে পাইকারি পর্যায়ে কাঁচা মরিচের দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি।

এর আগে আগস্টের শুরুতে কাঁচা মরিচের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় এবং দেশে ভারতীয় মরিচের সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। সরকারি তথ্যভিত্তিক বাজার পর্যবেক্ষণেও আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় কাঁচা মরিচ দেশে প্রবেশের তথ্য পাওয়া যায়।

ডিম-মুরগিতেও বাড়তি খরচ: 

ডিমের দামেও কমেনি চাপ। রাজধানীর বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পাড়া-মহল্লার দোকানে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

মুরগির বাজারও অনেকটা অপরিবর্তিত। ব্রয়লার প্রতি কেজি প্রায় ১৯০ টাকা, সোনালি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের দাম রয়েছে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।

এক মুরগি বিক্রেতা বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে সামনে কিছুটা দাম কমতে পারে।

তবে একই দিনের আরেকটি বাজার প্রতিবেদনে ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা কেজি পর্যন্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে—এতে বাজারভেদে দামের পার্থক্য থাকার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়।

মাছের বাজারে ক্রেতার হাঁসফাঁস: 

সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভূত হচ্ছে মাছের বাজারে। ২৫০ টাকার নিচে মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই ও কাতলা আকারভেদে ৩৮০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে মাছ কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, আগে কম দামের মাছ হিসেবে তেলাপিয়া বা পাঙাশের ওপর নির্ভর করতেন মধ্যবিত্তরা। এখন সেসব মাছের দামও বেড়ে যাওয়ায় মাছ কেনা কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

আরেক মাছ বিক্রেতার ভাষ্য, মাছের দাম খুব একটা কমছে না। কোনো দিন ২০ থেকে ৩০ টাকা কমলেও পরদিন আবার বাড়তে দেখা যায়।

ইলিশের বাজারে সাধারণ ক্রেতার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

মাসের বাজেটে বাড়তি চাপ: 

বাজারের এই চিত্র শুধু পণ্যের দাম বাড়ার হিসাব নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোকে একই আয়ে বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। কেউ মাছের বদলে ডিম কিনছেন, কেউ মাংস বাদ দিচ্ছেন, আবার কেউ প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনে ফিরছেন।

অর্থনীতির সাধারণ নিয়মে সরবরাহ বাড়লে পণ্যের দাম কমার কথা। কিন্তু বাজারে সরবরাহ, পাইকারি মূল্য, পরিবহন ব্যয়, আমদানি ও মধ্যস্বত্বভোগী—সবকিছুর প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য নিয়েও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে দামের বড় ব্যবধানের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

ফলে কোনো একটি পণ্যের দাম কমলেই বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। কাঁচা মরিচের দাম অর্ধেকের নিচে নেমে আসা যেমন ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর, তেমনি চিনি, তেল, ডিম, মাছ ও মাংসের বাড়তি দাম সেই স্বস্তিকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে।

বাজারে ঘুরে ক্রেতাদের কথায় তাই একটাই প্রশ্ন—একটি-দুটি পণ্যের দাম কমার পাশাপাশি কখন নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে?