ফ্যামিলি কার্ডে ২৮.৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে: বিশ্বব্যাংক

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৩৪ অপরাহ্ন, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৫:১৭ অপরাহ্ন, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

একাধিক খাদ্য ভর্তুকি একত্রিত করার পাশাপাশি বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হলে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও কার্যকরভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর লক্ষ্য করে পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: দেশের বাজারে কমল সোনার দাম

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে বিনিয়োগ কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে।

আরও পড়ুন: এলপি গ্যাসের দাম একলাফে ২৫২ টাকা বাড়ল

অন্যদিকে আর্থিক খাতের দুর্বলতা ঋণ বিতরণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সীমিত রাজস্ব আদায়ের কারণে সরকারের বড় বিনিয়োগ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।

দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে এবং বিপুলসংখ্যক নারী চাকরি হারিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও আরও বেড়েছে। খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিকে হতাশাজনক হিসেবে তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। বর্তমানে জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব হিসেবে আদায় হচ্ছে, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। এর ফলে প্রয়োজনীয় জনকল্যাণমূলক খাতে সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।

এদিকে রাজস্ব ঘাটতি ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কিছুটা সুরক্ষা দিলেও দেশের প্রায় অর্ধেক দরিদ্রতম পরিবার এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।

সংস্থাটির মতে, সামাজিক কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও উন্নত করা গেলে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ করলে প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার শনাক্ত করা এবং কর্মসূচির আওতার ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বৈশ্বিক বিভিন্ন ধাক্কা সামলেও দক্ষিণ এশিয়া তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। চলতি বছর এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। তবে বৈশ্বিক প্রতিকূলতার কারণে ২০২৭ সালে এ প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োহানেস জুট বলেন, প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। এই গতি ধরে রাখতে এবং তরুণদের জন্য আরও কর্মসংস্থান তৈরি করতে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারকে প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও উন্নত অর্থনীতির তুলনায় এ অঞ্চলের দেশগুলো এখনো পিছিয়ে। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। একই সঙ্গে সরকারগুলোও জনসেবা ও কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে এ প্রযুক্তি কাজে লাগাচ্ছে।

ভারতে ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে এআইভিত্তিক নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া এবং বাংলাদেশে এআইয়ের সহায়তায় উন্নত রেটিনাল স্ক্রিনিং—এ ধরনের উদ্যোগকে প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসোর্গে বলেন, এআই গ্রহণের মাধ্যমে শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, রপ্তানির সুযোগ ও বৈচিত্র্য সম্প্রসারণ এবং জনসেবার মান উন্নত করার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ সুবিধা পেতে হলে এআই ব্যবহারের পথে থাকা মৌলিক ও অবকাঠামোগত ঘাটতিগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে দূর করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের সুপারিশের মধ্যে একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, অন্যদিকে ব্যাংকিং, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।