জাবি মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স সেবায় সংকট ও অনিয়মের অভিযোগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স সেবা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের নির্ভরশীল পরিবারের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা। কিন্তু বাস্তবে জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়া, সীমিত সংখ্যক যানবাহন, চালক সংকট, লিখিত নীতিমালার অভাব এবং অতীতে ব্যক্তিগত কাজে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি করছে, আগের তুলনায় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরেছে এবং সীমিত জনবল ও অবকাঠামো নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা বলছে, জরুরি মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত সেবা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাবাজার পত্রিকার অনুসন্ধানে মেডিকেল সেন্টারের কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, অ্যাম্বুলেন্স চালক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহরে চারটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত হয় তিনটি। অপর একটি অ্যাম্বুলেন্স উপাচার্যের দাপ্তরিক ও বিশেষ প্রয়োজনে সংরক্ষিত থাকলেও জরুরি পরিস্থিতিতে সেটিও রোগী পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের নির্ভরশীল পরিবারের জন্য এই সংখ্যা যে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, তা স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরাও। কোনো অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিয়ে ঢাকায় গেলে দীর্ঘ যানজটের কারণে সেটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেবার বাইরে থাকে। ফলে একই সময়ে নতুন কোনো রোগীর জন্য অ্যাম্বুলেন্সের সংকট দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হন সেবাপ্রত্যাশীরা।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে শনিবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শামছুর রহমান জানান, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের জন্য এখনো কোনো লিখিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। প্রশাসনের নির্দেশনা এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম অনুসারেই সেবা পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা এই সেবা পাওয়ার অধিকারী। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেখাতে হয় এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় গুরুতর অসুস্থদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গভীর রাতে অনেক সময় সহপাঠী বা বন্ধু অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসন বা আইনগত অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে মানবিক দিক বিবেচনায় অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবেই অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন: প্রথমবারের মতো প্রভাব র্যাঙ্কিং স্থান পেল মাওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়
অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারে অতীতের অনিয়মের বিষয়টিও অস্বীকার করেননি প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, "৫ আগস্টের আগে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের ওপর কার্যত আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তখন বিভিন্ন ছাত্রনেতা প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যেতেন। চালকদের কাছ থেকে শুনেছি, কেউ কেউ ব্যক্তিগত কাজেও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতেন।" তবে বর্তমানে সেই পরিস্থিতি নেই বলে দাবি করেন তিনি। এখন নিয়মবহির্ভূতভাবে কেউ অ্যাম্বুলেন্স চাইলে বিষয়টি প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কোনো ছাত্রনেতা বা কর্মকর্তা নিয়মবহির্ভূতভাবে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ পাননি এবং ভবিষ্যতেও সে সুযোগ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাম্বুলেন্স সংকট রয়েছে। সংকট নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আবেদন করা হয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিবের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনায় চালক সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেডিকেল সেন্টার সূত্র জানায়, চারটি অ্যাম্বুলেন্স তিন শিফটে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ১২ জন চালক। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র আটজন। ফলে কোনো চালক অসুস্থ বা ছুটিতে থাকলে সেবায় বিঘ্ন ঘটে। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইসরাফিল হোসাইন বলেন, লোকবল কম থাকায় তাঁদের নিয়মিত অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। অনেক সময় টানা ডিউটি করতে হয়, এমনকি ঈদের সময়ও ছুটি মেলে না। এতে শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে।
প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শামছুর রহমানের মতে, বর্তমান চাহিদা পূরণে অন্তত আরও দুটি অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করা জরুরি। তাহলেই সময়মতো রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া বা অর্থের বিনিময়ে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন সময়। তবে এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সের অবস্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং চালকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হয়। প্রতিটি ট্রিপের হিসাব রেজিস্টারে সংরক্ষিত থাকে। ফলে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক কাজে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ নেই। চালক ইসরাফিল হোসাইনও একই দাবি করে বলেন, প্রতিটি যাত্রার তথ্য লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়, তাই অনিয়মের সুযোগ খুবই সীমিত।
জ্বালানি বরাদ্দ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের বিষয়ে প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা জানান, এসব বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিসের আওতাধীন। এ সংক্রান্ত কোনো অনিয়মের অভিযোগ তাঁদের কাছে আসেনি।
তবে প্রশাসনের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন শিক্ষার্থীরা। বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আতিকুজ্জামান আতিক বলেন, জরুরি সময়ে হটলাইনে ফোন করলে প্রায়ই জানানো হয় অ্যাম্বুলেন্স নেই। কোনোটি ঢাকায় রোগী নিয়ে গেছে, আবার কোনোটি অন্য হাসপাতালে রয়েছে। ফলে সংকটময় মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ি বা ভাড়া করা অ্যাম্বুলেন্সের ওপর নির্ভর করতে হয়।
মেডিকেল সেন্টারের প্যাথলজি বিভাগের কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সই পুরোনো হওয়ায় মাঝেমধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। আবার ঢাকার যানজটের কারণে একটি অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় ব্যস্ত থাকে। তাই একই গন্তব্যে একাধিক রোগী থাকলে তাঁদের একসঙ্গে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তিনি আরও জানান, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ভাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে এবং সেই অর্থ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা ব্যয়ে ব্যয় করা হয়।
সার্বিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অতীতের তুলনায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও জরুরি সময়ে সেবা না পাওয়া, লিখিত নীতিমালার অভাব, চালক সংকট এবং প্রয়োজনের তুলনায় অ্যাম্বুলেন্সের স্বল্পতা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি চিকিৎসাসেবার বড় চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত লিখিত নীতিমালা প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় চালক নিয়োগ, নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংযোজন, ট্রিপ রেজিস্টারের নিয়মিত নিরীক্ষা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্স সেবা আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও সময়োপযোগী হয়ে উঠবে।





