বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Shahrier Islam Pallab
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৩২ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৫:১৯ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের হাওর, নদী আর ভাটির জনপদ। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন, তাদের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, অভাব-অনটন আর সংগ্রাম-সবকিছু যেন একাকার হয়ে আছে এই জনপদের মাটিতে। সেই মাটি থেকেই উঠে এসেছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নিজের গান দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। আজ ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান ভাটির এই কিংবদন্তি শিল্পী। কিন্তু মানুষ চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি থেমে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর গান আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। 

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাহ আবদুল করিম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া করিমের শৈশব কেটেছে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ খুব বেশি না থাকলেও জীবন থেকেই তিনি শিক্ষা নিয়েছেন। মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, মানুষের জীবন দেখেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে রূপ দিয়েছেন গানে।

আরও পড়ুন: ভেনিসে সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতলেন বাংলাদেশের রাকায়েত রাব্বি

শাহ আবদুল করিমের গানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি গান করেছেন সাধারণ মানুষের জন্য। তাঁর গানে উঠে এসেছে কৃষক, শ্রমিক, জেলে, দিনমজুরসহ প্রান্তিক মানুষের জীবন ও সংগ্রাম। একই সঙ্গে প্রেম, বিরহ, মানবতা, আধ্যাত্মিকতা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিষয়ও গভীরভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর গানে।

ভাটির প্রকৃতি ছিল তাঁর সৃষ্টির অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। হাওরের জল, নৌকা, নদী, কাদা-মাটি আর মানুষের জীবনযুদ্ধ তাঁর গানের কথায় পেয়েছে এক অনন্য রূপ। তাঁর গান শুনলে মনে হয়, ভাটির কোনো এক গ্রাম থেকে ভেসে আসছে মানুষের নিজের জীবনের গল্প।

আরও পড়ুন: বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চলেছেন মিমি চক্রবর্তী

তাঁর গানের ভাষাও ছিল অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল। সাধারণ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষাতেই তিনি গভীর জীবনবোধের কথা বলেছেন। ফলে তাঁর গান বুঝতে কোনো কঠিন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়নি। গ্রামের মানুষ থেকে শহুরে শ্রোতা—সবাই সহজেই তাঁর গানের সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পেয়েছে।

শাহ আবদুল করিম শুধু বাউল গান গেয়েছেন—এমনটি বললে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি অনেকটাই ছোট করে দেখা হয়। তাঁর গান ছিল সমাজ ও সময়ের দর্পণ। তিনি অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রেম ও বিরহের গানেও তিনি ছিলেন অনন্য। মানুষের মনের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে সহজ কথায় প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাই তাঁর গান কখনো প্রেমিকের হৃদয়ে কথা বলে, কখনো বিরহী মানুষের চোখে জল আনে, আবার কখনো সংগ্রামী মানুষের মনে সাহস জোগায়।

শাহ আবদুল করিমের জীবনসঙ্গী সরলা বেগমও তাঁর সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক ও জীবনসংগ্রামের নানা অধ্যায় তাঁর গানেও প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সৃষ্টিশীলতা একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য গান সৃষ্টি করেছেন শাহ আবদুল করিম। তাঁর গান পরবর্তী সময়ে দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠেও নতুন করে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আধুনিক সংগীতের নানা আয়োজনেও তাঁর গান স্থান পেয়েছে। এতে তাঁর সৃষ্টির আবেদন যে সময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, সেটিই প্রমাণিত হয়েছে।

২০০১ সালে শাহ আবদুল করিমকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় এই সম্মান তাঁর শিল্পীজীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি। তবে তাঁর প্রকৃত অর্জন ছিল মানুষের ভালোবাসা। যে ভালোবাসা তাঁকে আজও ‘বাউল সম্রাট’ নামে স্মরণ করতে বাধ্য করে।

আজ তাঁর মৃত্যুর ১৭ বছর। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন ও সংগীতের ধরন। এসেছে নতুন প্রযুক্তি, নতুন প্রজন্ম, নতুন নতুন শিল্পী। কিন্তু শাহ আবদুল করিমের গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কারণ তাঁর গান শুধু গান নয়—এগুলো মানুষের জীবনের কথা। সেখানে আছে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, আনন্দ, বেদনা, প্রতিবাদ ও মানবতার বার্তা। তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি সুরে যেন মিশে আছে বাংলার মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ।

শাহ আবদুল করিম আজ আমাদের মাঝে নেই। নেই তাঁর সেই চেনা কণ্ঠ, নেই হাতে একতারা নিয়ে হাওরের পথে ঘুরে বেড়ানো মানুষটি। কিন্তু তাঁর গান আছে। তাঁর দর্শন আছে। আছে মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার কথা। ভাটির সেই মাটির মানুষ তাই আজও বেঁচে আছেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। যতদিন বাংলার মানুষের মুখে গান থাকবে, যতদিন প্রেম-বিরহ, দুঃখ-সংগ্রাম আর মানবতার গল্প থাকবে, ততদিন শাহ আবদুল করিমও বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।