গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১০ ফিলিস্তিনি নিহত
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এমন সময় এই হামলার খবর এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে যে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ২০ দফা চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে দুই পক্ষ।
ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজার মধ্যাঞ্চলীয় দেইর আল-বালাহ শহরে আল-হাওলি ও আল-জারু পরিবারে দুটি বাড়িতে বোমা হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, নিহতদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরও রয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হন।
আরও পড়ুন: ইরানে হামলা স্থগিত, ট্রাম্পকে সময় নিতে অনুরোধ নেতানিয়াহুর
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, নিহতদের একজন মুহাম্মদ আল-হাওলি হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেডের একজন কমান্ডার ছিলেন।
গাজা শহর থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ইব্রাহিম আল-খালিলি জানান, কাসাম ব্রিগেডের একজন ‘জ্যেষ্ঠ সদস্য’ নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, এই হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল স্পষ্ট করেছে যে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ তারা নিজেদের শর্তেই বাস্তবায়ন করতে চায়।
আরও পড়ুন: গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে উত্তেজনা: ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন জোরদার, অবস্থানে অনড় যুক্তরাষ্ট্র
প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় ধাপে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক একটি ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি অবনতি হলে সামরিক ‘উত্তেজনার’ বিকল্পও খোলা রাখা হয়েছে।
গাজাজুড়ে একাধিক হামলা
গাজার অন্যান্য এলাকাতেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। রাফাহ শহরের পশ্চিমে আল-আলাম গোলচত্বরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে একজন নিহত হন। গাজা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে আল-নাবলুসি জংশনের কাছে একটি পুলিশ পোস্টে হামলায় আরও একজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে আল-খাতিব পরিবারের বাড়িতে বিমান হামলায় দুজন প্রাণ হারান।
হামাসের নিন্দা, হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে
আল-হাওলি পরিবারের বাড়িতে হামলাকে ‘ঘৃণ্য অপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে হামাস। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, এই হামলা যুদ্ধবিরতির প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘অবজ্ঞা’ প্রকাশ করে। তবে তারা তাদের কোনো কমান্ডারের মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০০ জনের বেশি শিশু। একই সময়ে তিনজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে এখনো তাদের সেনা মোতায়েন রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের রূপরেখা
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। এই ধাপে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসনব্যবস্থা এবং গাজার পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন করা হবে এবং যাচাই করা ফিলিস্তিনি পুলিশ ইউনিটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের একটি টেকনোক্র্যাট কমিটি—‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’—গঠন করা হয়েছে।
মিশরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, এই কমিটির প্রধান হিসেবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী আলি শাথকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কমিটি বর্তমানে মিসরে বৈঠক করছে।
মানবিক সংকট অব্যাহত
জাতিসংঘের প্রকল্প পরিষেবা দপ্তর (UNOPS)-এর প্রধান জর্জ মোরেইরা দা সিলভা গাজায় পরিস্থিতিকে ‘অমানবিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন হলে পুনর্গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী গাজা পুনর্গঠনে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
আলি শাথ জানান, দ্বিতীয় ধাপে জরুরি ত্রাণ ও পুনর্গঠনই হবে অগ্রাধিকার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ছয় কোটি টন ধ্বংসস্তূপ জমে আছে, যেখানে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ, বিপজ্জনক বর্জ্য এবং মানবদেহের অংশও রয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে অন্তত ৭১ হাজার ৪৪১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: আল-জাজিরা





