হঠাৎ কেন ভয়াবহ যুদ্ধে জড়াল পাকিস্তান ও আফগানিস্তান

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছেন, তালেবান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে এবং দুই দেশ এখন কার্যত ‘উন্মুক্ত যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোর থেকে কাবুলের আকাশসহ আফগানিস্তানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান থেকে শক্তিশালী বোমা হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে হামলা শুরু হয়।

আরও পড়ুন: ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ জানালেন জ্যোতির্বিদরা

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, রাজধানী কাবুল ছাড়াও কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে তালেবানের সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিগেড সদর দপ্তর ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বলে তিনি দাবি করেন।

হামলার সময় আফগান বাহিনীর পক্ষ থেকে বিমান বিধ্বংসী কামান থেকে গোলা ছুড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: বলিভিয়ায় টাকা ভর্তি সামরিক কার্গো বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ১৫

বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এই হামলার পরপরই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, আমাদের ধৈর্য্যের পেয়ালা পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন আমাদের আর তোমাদের মধ্যে খোলাখুলি যুদ্ধ শুরু হলো।

এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয় গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, সেই হামলার প্রতিশোধ নিতে শুক্রবার ভোরে আফগান বাহিনী ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানগুলোতে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। 

তাদের দাবি, এই অভিযানে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছেন এবং তারা ১৯টি সামরিক পোস্ট ও দুটি ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে। তবে পাকিস্তান এই দাবির সত্যতা অস্বীকার করেছে।

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই দেশ থেকে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি দাবি করেছেন, তাদের হামলায় ১৩৩ আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এছাড়া ৮০০টিরও বেশি ট্যাংক, কামান এবং সশস্ত্র যান ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসলামাবাদ। 

অন্যদিকে, তালেবান সরকার বলছে, তাদের মাত্র ৮ যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে পাকিস্তানেরও দুই সামরিক সদস্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই সংঘাতের মূলে রয়েছে ২৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ডুরান্ড লাইন’। আফগানিস্তান এই সীমানাকে কখনোই বৈধ সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই পর্যন্ত দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে অন্তত ৭৫ বার ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

পাকিস্তান দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে তাদের দেশে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি) আফগান মাটিতে আশ্রয় পাচ্ছে। যদিও তালেবান এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, আফগানিস্তান ঐক্যবদ্ধভাবে তার মাতৃভূমি রক্ষা করবে। আন্তর্জাতিক মহলও এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরান ও রাশিয়া দুই প্রতিবেশীকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়েছে। ভারত এই বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহতের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে।

উভয় পক্ষ ভারি অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে সীমান্তে অবস্থান নেওয়ায় পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।