হুথিদের দখল বাড়ায় তেল পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি আরব

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০১ পূর্বাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৩ পূর্বাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পাইপলাইনে হামলার পর সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ।

বাগদাদ ও রিয়াদ জানিয়েছে, সৌদি আরবের ওই তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলাটি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার জন্য পরিচিত ইরাক থেকে পরিচালিত হয়েছিল। হামলার ঘটনায় ইরাক শনিবার দেশটির একজন সামরিক কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

আরও পড়ুন: বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা

প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি আরব উপদ্বীপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় এতদিন এই পাইপলাইন সৌদি আরবকে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তেল পরিবহনে সহায়তা করছিল।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছিল। এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

আরও পড়ুন: হুথিদের অবস্থানে ইয়েমেনি বিমান বাহিনীর হামলা

লোহিত সাগরে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে

সৌদি আরবের পাইপলাইনে হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছে।

হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার সঙ্গে লোহিত সাগরে হুথিদের তৎপরতা যুক্ত হওয়ায় আরব উপদ্বীপের উভয় পাশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

রয়টার্সকে ইয়েমেন সরকারের চারজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুক্রবার হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে অবস্থিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করেছে।

শুক্রবার তেল পাইপলাইন ও পেরিম দ্বীপে হামলা ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এই দুই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

বাব আল-মান্দাব ঘিরে হুথিদের অগ্রযাত্রা

ইরান-সমর্থিত হুথিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এর মধ্যে পেরিম ও হানিশ দ্বীপের পাশাপাশি মোখা ও ধুবাবের মতো উপকূলীয় শহরও রয়েছে।

এর ফলে লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে। এমন সময় এই অনুরোধ জানানো হয়েছে, যখন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

সৌদির তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলের ওপর দিয়ে যাওয়া ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা হয়।

হামলার জন্য সরাসরি কে দায়ী, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবিতে মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছে এবং পাইপলাইনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও তেল রপ্তানির ওপর এর প্রভাব তখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছিল।

ইরাকে সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত

ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শনিবার জানিয়েছে, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া সামরিক কমান্ডার মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন।

ইরাকের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মাইসান প্রদেশটি ইরানের সীমান্তবর্তী। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা ও প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর অনুরোধের পর সৌদি আরব এখন পর্যন্ত পাল্টা হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে সৌদি সরকার জানিয়েছে, নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে।

কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন সৌদির তেল সরবরাহ

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।

সংস্থাটির মতে, এর পেছনে বিভিন্ন কারণের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুথি-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলাও ভূমিকা রেখেছে।

হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই একসঙ্গে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।