‘সত্য কথনের যাত্রা শুরু করতে হবে’: রিজভী আহমেদ
গতকাল বিকেলে বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৯০ ও ২৪’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে ক্ষমতায়নের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে ধারা তৈরি হয়েছিল, সেই ধারার পরিবর্তন, সত্যকথন এবং সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরবার প্রয়াসে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে সত্যকথনের যাত্রা শুরু করতে হবে। ক্ষমতায়নের চিন্তার সাথে আপসকামী এবং লেজুড়বৃত্তিক বুদ্ধিবাদিতা বাদ দিয়ে মানুষের পক্ষে সততা ও ন্যায়ের পক্ষে মানসিক উন্নতির প্রেক্ষাপট রচনা করতে হবে, যা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই গড়ে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন: সশস্ত্র বাহিনীতে ১৪১ কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি
রিজভী বলেন, "আমাদের ইতিহাসে অনেক গৌরবময় ও মহিমান্বিত ঘটনা রয়েছে যা যথাসময়ে প্রকাশিত হয় না। আমাদের এই উপমহাদেশে বর্তমানে রাজনীতির এমন একটা সময় যাচ্ছে যেখানে সত্য কথা বলা, ইতিহাসের সত্য ঘটনা বই হিসেবে প্রকাশ করা এবং পাঠ করা একটি দুরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি বিষময় সময় আমরা পার করছি, পুরো উপমহাদেশ জুড়েই সেটা শুরু হয়েছে। তার মধ্যে যদি এ ধরনের উদ্যোগ থাকে যে ঘটে যাওয়া সময়গুলো ও দিনগুলো নিয়ে সত্য কথার উপর ভিত্তি করে বই রচনা করে প্রকাশ করা হয়, আমি মনে করি তারাই সার্থক মানুষ হিসেবে বিবেচিত হবে আমাদের দেশে, আমাদের সমাজে।"
জুলাই বিপ্লবের তাৎপর্য অনেক গভীর উল্লেখ করে তিনি বলেন, "১৬ বছর আমরা যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম, আমাদের যে নিপীড়ন ও নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছে, বারবার মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড, নির্যাতন; এই সকল সময়কে ধারণ করে যে পটভূমি রচিত হয়েছে তার মধ্য দিয়েই এদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের সূচনা করেছে। দেশের মানুষ চেয়েছে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর ভিত্তি করে এই দেশ পরিচালিত হবে। একজন মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর ভিত্তি করে এই দেশ পরিচালিত হতে পারে না। এদেশের সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে, সেই জনগণকে বঞ্চিত করে, সেই জনগণকে অপমানিত করে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের যে ভয়ংকর প্রেক্ষাপট এবং দুঃশাসন আমরা পার করে এসেছি, এই ইতিহাস ভুলে যাবার মতো নয়। তাই এ সময়ের ঘটনাগুলোকে নিয়ে সত্যকথন এবং তা সংরক্ষিত করে প্রকাশ করতে হবে। এখানে উপস্থিত বুদ্ধিজীবী, মননশীল ও সত্য কথনের মানুষদের এ দায়িত্ব নিতে হবে। তাহলেই আমরা আগামী প্রজন্মের কাছে একটি শুদ্ধ, সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে পারব; আর এই সঠিক ইতিহাস জেনে যে প্রজন্ম গড়ে উঠবে তাদের চেতনাই হবে দেশ গড়ার চেতনা।"
রিজভী আরও বলেন, "মিথ্যা ও বানোয়াট প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে, অপপ্রচার, কুৎসা ও মিথ্যাচার প্রচার করে জনগণের চিন্তাধারা যে পরিবর্তন করা যায় না তার প্রমাণই হলো জুলাই অভ্যুত্থান। একটা পর্যায়ে পারিবারিক সীমানা, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা অতিক্রম করে নির্দ্বিধায় রাজপথে নেমে এসে জীবন উৎসর্গ করেছে স্বৈরাচারী সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এক অনন্য বীরত্বের অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছে এদেশের তরুণ সমাজ ও ছাত্রসমাজ; এ এক বিরল ইতিহাস। এই পলিমাটি সমৃদ্ধ গাঙ্গেয় বদ্বীপ, এই বাংলাদেশেই এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন সম্ভব হয়েছে। এই দৃষ্টান্ত নতুন নয়; সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুগে যুগে এদেশের মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এদেশে ১৭৫৭ সালে রাজার মৃত্যুতে সাধারণ জনগণ আত্মাহুতি দিয়েছে, এদেশে সিপাহী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, ফকির বিদ্রোহ হয়েছে, সন্ন্যাস বিদ্রোহ হয়েছে, সাঁওতাল বিদ্রোহ হয়েছে, এদেশে ১৯৭১ সংঘটিত হয়েছে। হাজী শরীয়তুল্লাহ, মীরনিসার আলী তিতুমীর, ফরায়েজী আন্দোলন প্রভৃতির এক উর্বর ভূমি হচ্ছে এই বাংলাদেশ। মিথ্যা অপপ্রচার ও কুৎসা রটানোর মাধ্যমে এদেশের জনগণকে যে আটকে রাখা যায় না তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে এই জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এ জাতিকে কখনো দমন করে রাখা যায়নি। শেখ হাসিনাও এদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেননি। তারা জীবনমরণ প্রতিজ্ঞা করে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে রাজপথে থেকেছে। এই বিষয়গুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে তুলে ধরতে হবে আগামী প্রজন্মের সামনে।"
রিজভী তার বক্তৃতার শেষে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রম এবং দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যায় ও নির্যাতনের কথাগুলো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবার প্রয়োজন রয়েছে। মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে হবে প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের সততা তুলে ধরবার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি।





