উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক

১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ন, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১১:৫৬ অপরাহ্ন, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সব ধরনের অস্পষ্টতা দূর করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সর্বোচ্চ তিন দিন সময় লাগতে পারে এবং আগামী ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে পারে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেইন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অফিস চলবে। আর জোহরের নামাজের জন্য বেলা একটা থেকে সোয়া একটা পর্যন্ত বিরতি থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সময়সূচির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি রয়েছে। নির্বাচনের পরপরই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। এরপর দ্রুততার সাথে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি বলেন, সর্বোচ্চ দ্রুততার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে তিন দিনের মধ্যেও এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া সম্ভব। অর্থাৎ ১৫, ১৬ অথবা ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে পারে। প্রেস সচিব বলেন, বাংলাদেশে আগে নাটক করে যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং) ঘটানো হতো, এখন তেমন একটি ঘটনাও ঘটছে না। যারা অতীতে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে এবং বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। আমাদের বড় একটি দায়িত্ব হলো নির্বাচনের জন্য দেশকে প্রস্তুত করা। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একটি ভালো সংস্কারের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘জুলাই চার্টার’ তৈরি করা হয়েছে। জুলাই চার্টার এখন গণভোটে (রেফারেন্ডাম) এসেছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশের জনগণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর ফলাফল জানাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি আগে দুই-তিনজন লোকের হাতে কুক্ষিগত ছিল। সেখানে এখন একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আমাদের মেয়াদ যখন শেষ হয়ে আসবে, অর্থাৎ সরকার ছাড়ার আগ মুহূর্তে উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন। তিনি আরও বলেন, এটি খুবই আনন্দের বিষয় যে, এখন পর্যন্ত আমরা বড় কোনো সহিংসতা দেখিনি। অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। পুরো বাংলাদেশে নির্বাচনের আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত পরিণত (ম্যাচিউরড) আচরণ করছে। তাদের নেতারা সারা দেশে জনসভা ও ভাষণ দিচ্ছেন। আপনারা দেখছেন লাখ লাখ মানুষ এই ভালো নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে। আমরা আশা করি, একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন দেখতে পারব। নির্বাচনী সহিংসতার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা পুলিশের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছি। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১১৫ জন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২২ জন এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ৬ জন মারা গিয়েছিলেন। অন্যান্য নির্বাচনী সহিংসতার তুলনায় এবার পরিবেশ যথেষ্ট শান্তিপূর্ণ। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় ৫ জন মারা গেছেন।

একই সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের বিষয়ে ছড়ানো গুঞ্জন নিয়ে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকার ১৮০ কার্যদিবস ক্ষমতায় থাকবে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জনগণকে বিভ্রান্ত করার কোনো সুযোগ নেই। ডেপুটি প্রেস সচিব আরও বলেন, সরকার শুরু থেকেই নিশ্চিত করেছে যে, নির্বাচন শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সরে যাবে। ১৮০ কার্যদিবস নিয়ে চলমান আলোচনার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, এই সময়সীমাটি মূলত নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত। নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ‘গণপরিষদ' সদস্য হিসেবে সংস্কারসংক্রান্ত কাজগুলো করবেন। বিশেষ করে ‘জুলাই চার্টার' ও সংশ্লিষ্ট সংস্কারের ধারা-উপধারার আইনি ভাষা নির্ধারণের জন্য এই সময়টি প্রয়োজন হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো ভূমিকা থাকবে না বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

আরও পড়ুন: নতুন করে দুই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পুনর বণ্টন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১১৬টি অধ্যাদেশ জারি ও ১৪টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পরে যেসব কাজ হয়েছে, যেগুলো আইন হয়েছে, অর্ডিন্যান্স হয়েছে এবং এর সঙ্গে যেগুলো পলিসি হয়েছে বা অন্যান্য ইনস্ট্রুমেন্ট যেগুলো সাইন হয়েছেÑসেটার একটা প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়। সেখানে আমরা দেখছি যে, অধ্যাদেশ জারি হয়েছে ১১৬টি। এ সময়ের মধ্যে ৬৮টি রেগুলার সাপ্তাহিক কেবিনেট বৈঠক হয়েছে। এই কেবিনেট বৈঠকগুলোতে ৫২৬টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৫২৬টি সিদ্ধান্তের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে ৪৩৯টি। মানে এটার ইমপ্লিমেন্টেশনের হার ৮৩ শতাংশ। অধ্যাদেশ প্রক্রিয়াধীন আছে আরও ১৬টিÑএর মধ্যে নীতিগতভাবে আরো অধ্যাদেশ জারি হয়েছে মানে অনুমোদন হয়েছে তিনটি। আর নীতিমালা হয়েছে ১৪টি, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে ১৪টি। আর উপদেষ্টা পরিষদের জন্য সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়েছে মোট ৩৪৮টি।

সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব আরও জানান, সাধারণ মানুষের স্বস্তি দিতে এলপি গ্যাসের ওপর কর কমানোর বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এলপি গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরোপিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ আগাম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আমদানিকৃত এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রেও ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। শফিকুল আলম জানান, এই কর ছাড়ের ফলে এলপি গ্যাসের উপর করের বোঝা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে পড়বে এবং সাধারণ ভোক্তারা আগের চেয়ে কম দামে এলপি গ্যাস কিনতে পারবেন।

আরও পড়ুন: এক মাসে মধ্যপ্রাচ্যে সহস্রাধিক ফ্লাইট: শীর্ষে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত