সুজনের আলোচনায় বক্তারা

সংস্কারে কর্ণপাত না করলে দলগুলোকেই মাশুল দিতে হবে

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৪:৫০ অপরাহ্ন, ২৬ অগাস্ট ২০২৫ | আপডেট: ৪:৫০ অপরাহ্ন, ২৬ অগাস্ট ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বড় দলের আপত্তি এবং একের পর এক নোট অব ডিসেন্টে কার্যত থেমে আছে সংস্কারের উদ্যোগ। নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন—সব দলের ঐক্য ছাড়া সনদ কাগুজে হয়েই থেকে যাবে। বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি সংস্কারের বিষয়ে কর্ণপাত না করে, তাহলে এর মাশুল তাদেরকেই দিতে হবে। এমনকি শেখ হাসিনাকে অনুসরণ করলে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০ টায় সিরডাপ মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত জুলাই সনদ ও নাগরিক ভাবনা শীর্ষক নাগরিক সংলাপে’ এসব কথা তুলে ধরেন বক্তারা।

বিআডিজি’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মির্জা হাসান অভিযোগ করেন, নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করেই কমিশন শুধু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ করছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতামত আসবে কোথা থেকে? কমিশন বাধ্য না শুনতে। একটি বড় দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সব কিছু আটকে দিচ্ছে।’

আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে কিছু পক্ষ: সালাহউদ্দিন

ঢাবি শিক্ষক আসিফ মো. শাহান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, উচ্চকক্ষ গঠন, রাষ্ট্রীয় নিয়োগসহ নানা বিষয়ে বড় দলের আপত্তি থাকায় সনদ বাস্তবায়ন এখন প্রশ্নবিদ্ধ। রেফারেন্ডাম নাকি সংসদ—কোন পথে যাওয়া হবে, সেটিও অনিশ্চিত।’

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জনগণের বিরুদ্ধে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। নাগরিকরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন—তাদের মতের বিরুদ্ধে কিছু হলে তারা মানবেন না।’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ, সেনা মোতায়েন

জুলাই শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও হতাশার সুর ভেসে এসেছে। সেবন্তি নামে এক শহীদের মা প্রশ্ন তুলেছেন—‘এক বছর পরও শহীদ পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে কিছু হয়নি। এটা আমাদের জন্য লজ্জার।’

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ‘অল্প সময়ে তারা বড় অগ্রগতি এসেছে। নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব থেকে শুরু করে সাংবিধানিক কাঠামোর সংস্কার পর্যন্ত নানা বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।’ তবে স্বীকার করছেন—বড় দলের নোট অব ডিসেন্টের একটি বড় বিষয়।

তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিধিব্যবস্থা পাল্টে যাবে। এটাও আমাদের কোভিডের অভিজ্ঞতার মতো হবে কি না, যা সবাই ভুলে যাব। কমিশন ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে সবাই ভাবে। কমিশন গঠিত হওয়ার আগে ৬টি কমিশন হয়েছিল। আগের কমিশনগুলো সম্ভাব্য পাত্রী-পাত্রী দেখিয়েছে, ঐকমত্য কমিশন ঘটকের ভূমিকায় আছে। আমি হতাশ করার জন্য বলছি না, বিবেচনায় রাখার জন্য বলেছি।’

বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে না এলে জুলাই সনদও আগের সংস্কার প্রক্রিয়ার মতোই থমকে যাবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সনদ আবারও কেবল কাগুজে দলিল হয়ে পড়ার শঙ্কাই এখন বড় হয়ে উঠেছে। দিন যত বাড়ছে নির্বাচন প্রশ্নে জুলাই সনদ তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জুলাই সনদকে কীভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, এর উপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘চিন্তা করার জায়গা হয়েছে আমাদের। পিআর সম্পর্কে দুটি পদ্ধতি আছে—একটা আসন ভিত্তিক, অন্যটা ভোটের সংখ্যানুপাতিক। নিম্নকক্ষে আসন পদ্ধতি আগের মতোই, উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। উভয়েরই নেতিবাচক-ইতিবাচক দিক রয়েছে। সবগুলো নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বাস্তবায়ন হলেই এতদিনের শ্রম সার্থক। আমাদের অনেক করণীয় আছে। সরকার অনেকগুলো সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারেন অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশে। আমরা অব্যাহত রাখব যতক্ষণ তীরে তরী না ভেড়ে। সংস্কার কমিশন করা হয়েছে পরিবর্তনের জন্য। নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নির্বাচন কমিশন বাস্তবায়ন করবে, কেন তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সেটার জবাবদিহিতা করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। নির্বাচন কমিশন যদি সদাচারণ না করে, দায়িত্বে না থাকে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে—তখন তাদেরকে আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করেছি। এগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দলগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নোট অব ডিসেন্ট দিয়েই শেষ নয়।’