বায়ু, শব্দ ও আলোক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
রাজধানীসহ সারাদেশে বায়ু, শব্দ ও আলোক দূষণ ক্রমেই জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ। দূষণের বহুমাত্রিক এই সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ এবং আলোক দূষণের করণীয় ও তার বন্দোবস্ত’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: মহানবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম । তিনি পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
বক্তারা বলেন, পরিবেশ দূষণ এখন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বায়ু, শব্দ ও আলোক দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে পড়ছে। তাই দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
আরও পড়ুন: র্যাবের এডিজি ও রংপুর কমিশনারসহ পুলিশের উর্ধ্বতন ১৭ কর্মকর্তার রদবদল
সেমিনারে বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বায়ু, শব্দ ও দৃষ্টি বা আলোক দূষণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পরিবেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। দূষণের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নগরজীবনে যানবাহন, নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য উৎস থেকে সৃষ্ট শব্দদূষণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। একইভাবে অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত আলোকসজ্জা পরিবেশ ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনচক্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সেমিনারে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া কর্মপরিকল্পনার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা জানান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০২১ সালে ‘মাল্টিসেক্টোরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ প্রণয়ন করে। এতে প্লাস্টিক দূষণ কমানো এবং টেকসই প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভার্জিন প্লাস্টিক উপকরণের ব্যবহার ৫ শতাংশ কমানো এবং ২০২৬ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন কমানোর বিষয়েও বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই পরিবেশ দূষণ বন্ধ হবে না। নীতিমালার বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম, এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন এবং স্থপতি ইকবাল হাবিব। তাঁরা পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন দিক, এর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব এবং তা নিয়ন্ত্রণে করণীয় তুলে ধরেন।
অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ ও বাপার নির্বাহী সদস্য আহসান রনিও আলোচনায় অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে নগর এলাকায় শব্দ ও আলোক দূষণের উৎস চিহ্নিত করে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
সভাপতির বক্তব্যে বাপার সভাপতি ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার পরিবেশ সুরক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ ও দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির।
সেমিনারে বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, বায়ু, শব্দ, আলোক ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ঘোষিত নীতি ও কর্মপরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে।





