ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চট্টগ্রাম বন্দর নিউমুরিং টার্মিনালের চুক্তি সই
মোহাম্মদ রুবেল অবশেষে শ্রমিকদের তীব্র ক্ষোভ প্রতিবাদ, আলোচনা-সমালোচনা আর পুলিশের সাথে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলোচিত প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী আগামী ১৫ বছর লাভজনক এই টার্মিনালটি পরিচালনা করবে দুবাইভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
তবে এদিন চুক্তি স্বাক্ষরের আগে থেকেই বন্দর রক্ষা কমিটির ব্যানারে রাজধানীর আগারগাওয়ের ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামের সামনে বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা কর্মীরা বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে।
আরও পড়ুন: গিয়াস উদ্দিন রিমন সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী নিযুক্ত
এ সময় পুলিশি বাধায় বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্র ভঙ্গ করে দেয়। তাদের মধ্যে ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। চুক্তি বাতিলের দাবিতে সেখান থেকেই বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও আন্দোলনকারীরা।
এরআগে গত বুধবার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতা তপন দত্তও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করে চুক্তি করায় বৃহত্তর আন্দোলনের জন্ম দিবে। বিক্ষোভকারীরা ১৩ অক্টোবর বন্দর চেয়ারম্যানকে ঘেরাও করার ঘোষণা দিয়েছেন। সেখান থেকে পরবর্তীতে আরও কর্মসূচি ঘোষণা আসবে। সব মিলিয়ে, এনসিটি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সরকারের নির্ধারিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বন্দর শ্রমিকদের বিরোধিতা তীব্র হওয়ায় টার্মিনালে থম থমে বিরাজ করছে।
আরও পড়ুন: রামপালের সৌরবিদ্যুৎ জ্বালানিতে আশার আলো
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটরিয়ামে ১৫ বছরের কনসেশন (ইজারা) চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সই হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম চুক্তিপত্রে সই করেন। শ্রমিকদের আপত্তি যেখানে: বন্দরের শ্রমিককর্মচারীদের একাংশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন।
এমনকি, এ চুক্তির বিরোধিতা করে বৃহস্পতিবারও ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামের সামনে অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। গত কয়েক মাস ধরেই শ্রমিক কর্মচারীরা বিদেশি কোম্পানির কাছে দায়িত্ব দেয়ার বিপক্ষে অনশন, বিক্ষোভ, মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের বক্তব্য, দেশের আমদানি-রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা নির্দিষ্ট ট্যারিফের ওপর চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা করি। কিন্তু বিদেশিদের দিলে তাদেরকে কমিশন দিতে হবে। এভাবে চলে গেলে আমার দেশ ডলারে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে না।” “চট্টগ্রাম বন্দর সেমি-অটোমেটেড বন্দর। এটিকে আধুনিকায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে কেন আমরা বিদেশিদেরকে দিচ্ছি? চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমরাই তো দক্ষ করতে পারি। আর চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে? পায়রা বা মোংলা বন্দরে ডেভেলপ করার সুযোগ রয়েছে। সেগুলোকে না দিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বন্দরকে কেন বিদেশিদেরকে দিচ্ছে?” যদিও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ-এর সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম মনে করছেন, বিদেশি কোম্পানির হাতে দায়িত্ব যাওয়ায় টার্মিনালের সক্ষমতা অবশ্যই বাড়বে। “কিন্তু মূল সমস্যা হলো, ৭০ শতাংশ কনটেইনার ঢাকাগামী এবং এগুলোর জন্য ল্যান্ড করিডোর নেই। রেলওয়েতেও খুব একটা জায়গা পায় না। জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর পারফরম্যান্সও কম। এই ধরনের সমস্যাগুলো সমাধান হলে নিঃসন্দেহে সুবিধা পাবো আমরা,” যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, “বন্দরে কনটেইনার চারদিন বিনামূল্যে থাকে এবং এরপর স্টোর রেন্ট দিতে হয় বন্দরকে। স্টোর রেন্টের লাভ কাম্য হতে পারে না। দেখতে হবে অপারেশনাল লাভ কীরকম হচ্ছে।” তবে এখন কেউ যাতে চাকরি না হারায়, সেটিও বিবেচনা করা উচিত বলে মত তার। চুক্তির বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল
আলম গতকাল এক সংবাদ সম্মলনে জানিয়েছেন, “পোর্ট ইজারা দেওয়া আর কনটেইনার হ্যান্ডলিং একই জিনিস নয়। যারা বলছে পোর্ট ইজারা দেওয়া হচ্ছে, তারা এই চুক্তি সম্বন্ধে জ্ঞাত নয়।” “এই পোর্টের মালিকানা, নিরাপত্তা, সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখভালের দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের, এনবিআরের, কাস্টমসের, গোয়েন্দা সংস্থার, নিরাপত্তা বাহিনীর। এটা ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে যাচ্ছে না।” সরকারের উদ্দেশ্য এই টার্মিনালকে আন্তর্জাতিক মানের করা, প্রযুক্তিগত দিক থেকে আধুনিকায়ন করা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আমদানি-রপ্তানি বাড়ানো, অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনাসহ বেশ কিছু বিষয়। “ম্যানুয়াল বা অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে এটিকে মুক্ত করা হলো প্রাপ্তি। আমরা প্রতি বছর ১০ কোটি টাকা পোর্ট থেকে পাবো। যে রাজস্ব সংগ্রহ হবে, তার ৬৭ শতাংশ সরকার পাবে। অর্থাৎ, আধুনিক পোর্ট পাচ্ছেন, অর্থনৈতিক সম্পৃদ্ধি ও অগ্রগতি পাচ্ছেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের দক্ষ করতে পারছেন,”।
তিনি জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালকে নতুন করে সাজানোর জন্য ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে এবং বাংলাদেশ ৬০০ কোটি টাকা সাইনিং মানি হিসেবে পাচ্ছে। আরও বলেছেন, “এই চুক্তির সাথে চাকরি যাওয়া বা শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং, ডিপি ওয়ার্ল্ড যখন এটিকে ঢেলে সাজাবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ এখানে আসবে, তখন এখানে চাকরির সুযোগ বাড়বে ও কর্মীদের দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনা আছে।
উল্লেখ্য, এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পিপিপি ও জিটুজি কাঠামোয় শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা দর-কষাকষির পর্যায়ে পৌঁছালেও শ্রমিক আন্দোলন ও আলোচনা কমিটির সদস্যদের আপত্তির কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে যায়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার আলোচনা শুরু হয়। গত জুনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষি চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়।
গত অর্থবছরে এই টার্মিনাল দিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে, যা বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল পরিচালনা করবে। চট্টগ্রাম বন্দরের অন্য তিনটি টার্মিনালের মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশীয় অপারেটররা পরিচালনা করছে। আর পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই)।
প্রসঙ্গত, এই চুক্তি সইয়ের আগে থেকেই শ্রমিকরা বিরোধীতা করে আন্দোরন করে আসছিল। তারই প্রেক্ষিতে এ চুক্তির বিরোধিতা করে গতকাল দুপুর দুইটা থেকে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে সিপিবি, বাসদসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। বেলা পৌনে তিনটার দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এ সময় সেখানে উপস্থিত সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা আজ সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই বিডা ভবনের সামনে এসেছিলাম।
আমরা মনে করি, এ চুক্তি বাংলাদেশকে বিক্রি করার শামিল। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সম্পৃক্ততা আছে, তাদের ওয়েবসাইটে গেলে বিষয়টি বোঝা যাবে।’ আরও বলেন, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়ার মনে হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে। আমাদের নৌবন্দর, বিমানবন্দর—সব ব্যবহার করবে তারা।’ ‘এর প্রতিবাদ করার জন্যই আজ আমরা এখানে এসেছি। আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ছিল। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের এক পর্যায়ে পুলিশ বিনা উসকানিতে লাঠিপেটা করে। আজ যারা বাংলাদেশটাকে আমেরিকার কাছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন, তারা আজীবন দেশের বিশ্বাসঘাতক, বেইমান হিসেবে চিহ্নিত হবেন। আমরা বামপন্থীরা লড়াইয়ের মাঠে থাকব। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা দেশের বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা করব।’ সিপিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশে ব্যাপক লাঠিপেটা করেছে পলিশ। এতে সাজ্জাদ জহির চন্দনসহ অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি শ্রমিকদের-এনসিটি-সিসিটি ইজারা বাতিলের দাবিতে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের বিক্ষোভ: চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
চুক্তির বিরোধীতা করে গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৪টা ১০ মিনিট পর্যন্ত বন্দর ভবনসংলগ্ন বোনানজা পোর্ট রেস্টুরেন্ট গেট এলাকায় এ কর্মসূচি পালিত হয়। বিক্ষোভে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিন ড্রাইভার (প্রথম শ্রেণি) ইব্রাহিম খোকন, সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, তপন দত্ত, তসলিম হোসেন সেলিম, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও আল কাদেরী জয় উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হলে এর প্রভাব শ্রমিকদের পাশাপাশি বন্দরের স্বার্থের ওপর পড়তে পারে। তাই ইজারা প্রক্রিয়া বাতিল করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা। সংগঠনের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় ১২ অক্টোবর বেলা ১১টায় অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তিনি। ওই অনশন কর্মসূচি থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান হুমায়ুন কবির। পরে বন্দর ভবনসংলগ্ন বোনানজা পোর্ট রেস্টুরেন্ট গেট থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নিমতলা বিশ্বরোড ঘুরে পুনরায় শুরুর স্থানে এসে শেষ হয়। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি শেষ করেন বিক্ষোভকারীরা।
একই প্রেক্ষিতে গত বুধবার বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, শ্রমিকরা আশা করেছিল বর্তমান সরকার এমন একটি প্রক্রিয়া বন্ধ করবে যা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল। ‘আমরা যদি আপনাদের বোঝাতে পারি, তবে কোনো অবস্থাতেই চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেবেন না। আমরা যদি বোঝাতে ব্যর্থ হই, তবে আপনারা আপনাদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’
অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতা তপন দত্ত সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করা হলে তা বৃহত্তর আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে। বিক্ষোভকারীরা ইতোমধ্যে ৭ অক্টোবরের জন্য একটি মশাল মিছিল এবং ১৩ অক্টোবরের জন্য বন্দর চেয়ারম্যানকে ঘিরে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।
গত সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবনের সামনে এক অবস্থান কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বন্দর অচল করে দেওয়ার এই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আপনারা যদি কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেন, তবে চট্টগ্রাম বন্দর তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। শুধু বন্দরই নয়, কুতুবদিয়া বহির্নোঙর পর্যন্ত কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হবে। আন্দোলনকারীরা কেবল এনসিটি নয়, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থেও (জিসিবি) বিদেশি অপারেটরদের প্রস্তাবিত সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করছেন।
সব মিলিয়ে, এনসিটি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সরকারের নির্ধারিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বন্দর শ্রমিকদের বিরোধিতা তীব্র হওয়ায় টার্মিনালটি আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১৫ বছরের ইজারা অনুমোদন করেছে সরকার: অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি এবং ওসিওয়াই-এর খসড়া কনসেশন চুক্তি নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার কয়েক দিন পরেই বন্দর অচল করে দেওয়ার এই হুমকি আসলো। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১ অক্টোবরের এই অনুমোদন ১৫ বছরের পিপিপি ইজারার প্রধান বাধা দূর করে। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটির প্রজেক্ট প্রোফাইল অনুযায়ী, এনসিটির আধুনিকীকরণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুবাই সরকার মনোনীত ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে প্রাথমিক নীতিগত অনুমোদন পেয়েছিল।
সর্বশেষ অনুমোদনটি মূলত খসড়া কনসেশন চুক্তির সাথে সম্পর্কিত, যা ১৫ বছরের টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করবে। সরকার এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই প্রক্রিয়া গতি পায়; তবে ডিপি ওয়ার্ল্ড খসড়া কনসেশন চুক্তি পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় চাইলে তা কিছুদিন থমকে যায়। পরবর্তীতে নতুন সরকার এই প্রক্রিয়াটি পুনরায় চালু করে।
গত মে মাসে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পিপিপি মডেলের অধীনে এনসিটির প্রস্তাবিত বেসরকারি পরিচালনার জন্য একটি মূল্যায়ন কমিটি পুনর্গঠন করতে সিপিএকে নির্দেশ দেয়। সিপিএ পরবর্তীতে আলোচনা কমিটির জন্য একটি ১২ সদস্যের সহায়ক দল গঠন করে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এই প্রকল্পের লেনদেন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে, যা ডিউ ডিলিজেন্স, ট্রানজেকশন স্ট্রাকচারিং, প্রস্তাবের অনুরোধ (আরএফপি) ও কনসেশন চুক্তি প্রস্তুত করা এবং নির্বাচিত আন্তর্জাতিক অপারেটরের সাথে আলোচনার সুবিধার্থে কাজ করছে।





