ঝুঁকিতে সৌদি শ্রম বাজার পবিবারে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

Sanchoy Biswas
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ৫:২১ অপরাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৫:২১ অপরাহ্ন, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • সৌদিতে হুতি হামলার কারণে ৯ হাজার ২৬৯ বাংলাদেশি যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত
  • সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিঘ্ন, বেবিচকের জরুরি নির্দেশন
  • সৌদি আরবে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের খোঁজ রাখা হচ্ছে : প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী
  • সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত
  • বেবিচকের তথ্যমতে ৬১টি ফ্লাইটে সরাসরি প্রভাব পড়েছে

সৌদির আকাশসীমায় হুতি বিদ্রোহীদের উপর্যুপরি হামলা ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটে দেশটির বিশাল শ্রমবাজার এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে থাকা লাখো প্রবাসী পরিবারের ওপর, যার ফলে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়া, বাংলাদেশিদের প্রাণহানি এবং কর্মসংস্থানের চরম অনিশ্চয়তায় দেশের রেমিট্যান্স খাতের সবচেয়ে বড় এই স্তম্ভটিকে ঘিরে এখন বড় ধরনের সংকটের মেঘ জমছে। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সবচেয়ে বেশি আসে সৌদি আরব থেকে। সেখানে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ থমকে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তাঁরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৯৫ কোটি ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে এসেছিল প্রায় ৫৮৫ কোটি ডলার, যা মোট প্রবাহের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মাধ্যমে দেশটি বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বৃহত্তম উৎস হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় সৌদি আরব ছিল বাংলাদেশের বিপুল অদক্ষ শ্রমশক্তির জন্য আশার জায়গা। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল দেশটিকে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে ব্যবসা ও পর্যটনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে রূপ দেওয়া। সেই পরিকল্পনার কারণে শ্রমবাজার আরও প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য। শুধু সেপ্টেম্বরেই দেশটি ৩২ হাজার ৯১৫ জন কর্মীর ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু হুথিদের হামলা এখন সেই অর্থনৈতিক রূপান্তরের উদ্যোগকেই পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলার জেরে সৌদি আরবগামী ফ্লাইট একের পর এক বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। ছুটিতে দেশে আসা কর্মীরা কাজে ফিরতে পারছেন না। যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ায় তাঁদের ভিসার মেয়াদ ও চাকরি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরব। অন্য কয়েকটি বড় শ্রমবাজার বন্ধ বা সংকুচিত হওয়ায় দেশটির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যদিও এ বছরের শুরু থেকে সৌদিতে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমছে। এখন সৌদিতে হামলা ও বিমান চলাচল বিঘ্নের ঘটনায় বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের ওপর এসেছে নতুন ধাক্কা। সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার জেরে বিভিন্ন ফ্লাইটের ৯ হাজার ২৬৯ জন বাংলাদেশি যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই যাত্রীদের ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল। তবে এই হিসাবের মধ্যে রিয়াদ এয়ারওয়েজের যাত্রীর সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত নয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। বেবিচক বলছে, রিয়াদ এয়ারওয়েজের তথ্য পাওয়া গেলে মোট ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীর হিসাব হালনাগাদ করা হবে। বেবিচকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ চলছে। এ কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ৬১টি ফ্লাইটে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত হয়েছে। বেবিচক বলছে, গত শনিবার রাত থেকে গত সোমবার মধ্যরাত নাগাদ এসব ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। বেবিচকের তথ্যমতে, ৬১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ২২টি। বাকি ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট।

আরও পড়ুন: বিবিসিসিআই’র নতুন ডিরেক্টর জহিরুল ইসলাম সিআইপি

সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ৪টি ও রিয়াদ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ৭টি। অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, এমিরেটসের ৯টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৫টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৫টি, সালাম এয়ারের ৩টি ও ইজিপ্ট এয়ারের ১টি ফ্লাইট রয়েছে। বেবিচকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধের প্রভাব এখন শুধু সরাসরি ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ট্রানজিট ফ্লাইটও এর আওতায় এসেছে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণ-পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে দফায় দফায় সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে হামলা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয় গত শনিবার। এসব হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ মোট ১৪ জন নিহত হন। আহত অনেকে। এরপর ঢাকা থেকে রিয়াদগামী ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে থাকে। ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদগামী সব ফ্লাইট হয় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো বাতিল করা হয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান। অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা পথে ইউএস -বাংলার সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা, রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। এ বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি কমে হয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এই কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।

আরও পড়ুন: সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ বাংলাদেশি নিহত

সৌদি আরবে বিমানবন্দরে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গতকাল মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের বন্দরে শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শ্রম উইং সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমাদের ২ প্রবাসী মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেকেই আহত হয়ে স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমরা সার্বক্ষণিক তাদের চিকিৎসার খোঁজ নিচ্ছি। আমি নিজেও আহতদের একজনের বাবার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে সমবেদনা জানিয়েছি ও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছি।’ সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোকে জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

যাত্রীদের সময়মতো ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জানানো, পুনঃবুকিং ও অর্থ ফেরতসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া এবং বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। গত সোমবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয় থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সীমিত কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এর আগে রিয়াদ বিমানবন্দর সাময়িক বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতেও পৃথক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিলো। বেবিচকের দুটি নির্দেশনায় যাত্রীদের নিরাপত্তা, কল্যাণ, সময়োপযোগী যোগাযোগ এবং বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে রিয়াদ বিমানবন্দরের অস্থায়ী বন্ধসংক্রান্ত প্রথম নির্দেশনায় জানানো হয়, বিমানবন্দরটি ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টা পর্যন্ত বন্ধ থাকার কথা ছিল। এ পরিস্থিতিতে রিয়াদে সরাসরি কিংবা ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব বিমান সংস্থাকে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে ১২ অক্টোবর জারি করা আরেকটি নির্দেশনায় বেবিচক জানায়, বিরাজমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবজুড়ে বিমানবন্দর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন ঘটছে। ফলে দেশটিতে সরাসরি বা ট্রানজিট ফ্লাইট পরিচালনার জন্য নির্ধারিত বিমান সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।