চিকিৎসকদের বদলি-পদায়নে অটোমেশনে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়

Sadek Ali
খোদাকাত হাসান
প্রকাশিত: ৮:৫২ পূর্বাহ্ন, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫২ পূর্বাহ্ন, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

* কাজের গতি ফেরাতে আমূল পরিবর্তনের চিন্তা-ভাবনা

* বন্ধ হবে অনৈতিক লেনদেন, যোগ্যরা পাবেন মর্যাদা

আরও পড়ুন: হঠাৎ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা

* জ্যেষ্ঠতা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে চিকিৎসকদের পদায়ন

* তদবির ও সুপারিশের কোনো সুযোগ থাকছে না

আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের মার্কেট এখন বাংলাদেশ

সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান উন্নয়ন, চিকিৎসকদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মস্থলে উপস্থিতি- জবাবদিহি, প্রশাসনিক জটিলতা, রোগীর ভোগান্তি কমানো এবং সংস্কার বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অটোমেশন হচ্ছে চিকিৎসকদের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়ন। এসব কার্যক্রমে সামনে এসেছে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা। এর ফলে বন্ধ হবে দুর্নীতি, অনৈতিক তদবির ও লেনদেন। একইসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের দাফতরিক বিভিন্ন কাজে গতি আসবে এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চিকিৎসকদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজনীয় সহায়তা ছাড়া কেবল প্রশাসনিক নজরদারি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। হাসপাতাল পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহে জটিলতা চিকিৎসাসেবার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং হাসপাতালভিত্তিক সমস্যার নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, পদায়ন এবং পেশাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে কর্মক্ষেত্রে আগ্রহ ও দায়িত্বশীলতা বাড়তে পারে। চিকিৎসাসেবায় পরিবর্তনের প্রধান সুফল পৌঁছাতে হবে সাধারণ মানুষের কাছে। সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ অপেক্ষা, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিলম্ব, শয্যাসংকট এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সীমিত প্রাপ্যতার মতো সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে বড় হাসপাতালের ওপর চাপ কমতে পারে।

পাশাপাশি জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ এবং রেফারেল ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন আনা গেলে রোগীরা তুলনামূলক দ্রুত সেবা পাবেন। তবে স্বাস্থ্য খাতে টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন, হাসপাতালের সেবার মান পর্যবেক্ষণ, জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি নিরূপণ এবং রোগীদের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। চিকিৎসক, হাসপাতাল প্রশাসন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং রোগীদের প্রতিনিধির সমন্বয়ে নিয়মিত মূল্যায়নব্যবস্থা চালু করা গেলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা ও সমাধানের অগ্রগতি যাচাই করা সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এলেও সরকার যদি কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা বজায় রাখতে পারে, তবে এই উদ্যোগটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও মাইলফলক পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হবে। তারা মনে করছেন, এ ধরনের সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে শুধু সরকারি চিকিৎসকদের মানসিক কর্মপরিবেশই উন্নত হবে না, বরং সামগ্রিকভাবে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। চিকিৎসকরা দুশ্চিন্তামুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সেবার মান ও ব্যবস্থাপনায় দ্রুত লক্ষণীয় পরিবর্তন আসবে। জানা গেছে, নতুন এই পদায়ন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা পাবেন মেধাবী ও যোগ্য চিকিৎসকরা। এতদিন মেধা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অনাকাঙ্ক্ষিত নানামুখী প্রভাবে অনেকে উপযুক্ত পদে পৌঁছাতে পারতেন না। কিন্তু এখন থেকে চিকিৎসকদের দক্ষতা, কর্মস্থল, জ্যেষ্ঠতা ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পদায়ন নির্ধারিত হবে। সেইসঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্দিষ্ট কর্মস্থলে সন্তোষজনক পারফরম্যান্স দেখালেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যথাসময়ে পদায়ন হবে। এর ফলে চিকিৎসকদের মধ্যে কাজের নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অসন্তোষ ও হতাশা অনেকাংশে কমে আসবে। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নিঘাত স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। বদলি ও পদায়নের এই স্বচ্ছতা পরোক্ষভাবে দেশের প্রান্তিক ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে। সঠিক স্থানে সঠিক চিকিৎসক পদায়িত হলে এবং বদলি প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা দূর হলে চিকিৎসকরা আরও নিশ্চিত্তে সেবা দিতে পারবেন। ফলে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকার চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও সেবা ঘাটতি পূরণ হবে এবং দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্যখাতের বড় সংকট কাঙ্ক্ষিত পদায়ন কিংবা বদলি নিয়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন এবং উচ্চপর্যায়ের তদবির সংস্কৃতি। এতে বিরক্ত স্বয়ং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারও। কর্মকর্তারা কোনো ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও তাদের অপবাদ সহ্য করতে হয়। তাতে নষ্ট হয় কাজের স্পৃহা। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে বন্ধ হবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সুপারিশ। এছাড়া পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় এবং নির্দিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ও দুর্নীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তারা বলছেন, চিকিৎসকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এই সিস্টেমে প্রতিটি চিকিৎসকের যোগদানের তারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিশেষ প্রশিক্ষণ, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, দুর্গম অঞ্চলে সেবাদানের সময়কাল এবং কাজের সামগ্রিক মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো চিকিৎসকের বদলি বা পদায়নের যোগ্যতা নির্ধারণ করবে, যা মানবীয় হস্তক্ষেপের সুযোগ একবারে কমিয়ে আনবে।

এর আগে স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে অটোমেশন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। বিষয়টি আমলে নিয়েছে বর্তমান সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকরাও চান স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও গতি আনতে। স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও। ইতিমধ্যে নানা পদক্ষেপও নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কথা হয় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন এর সঙ্গে। তিনি বলেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বদলি ও পদায়নে অটোমেশন ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু অটোমেশন দিয়ে দুর্নীতি দূর করা বা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতিমালা, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর জবাবদিহি। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, জনবলের প্রয়োজন ও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনার পাশাপাশি আপিলের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. আহমেদ আহসানুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কমিশন থেকে ৩০টিরও বেশি মূল সুপারিশ জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিতে অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা। মেধভিত্তিক সমাজ তৈরির অংশ হিসেবে সরকার মেধভিত্তিক অটোমেশন পদ্ধতিতে পদায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত তদবির ও দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে নানা বাধা অতিক্রম করতে হবে। তবে সরকার ধাপে ধাপে যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তা সঠিক দিক নির্দেশ করে।