পরকীয়ার অভিযোগে বিচার নয়, প্রকাশ্য বর্বরতা
দর্শনার কুন্দিপুরে গৃহবধূ ও যুবককে চুল কেটে জুতার মালা পরিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন নেহালপুর ইউনিয়নের কুন্দিপুর গ্রামে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস ঘটনায় এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জেলাজুড়ে। পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক গৃহবধূ ও তার কথিত প্রেমিককে প্রকাশ্য দিবালোকে চুল কেটে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। সামাজিক বিচার-এর নামে সংঘটিত এই ঘটনা অনেকের কাছেই মধ্যযুগীয় বর্বরতার নগ্ন প্রদর্শন বলে মনে হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা হলেন, কুন্দিপুর গ্রামের মো. আরিফের স্ত্রী
আসমা বেগম (২৫) ও একই গ্রামের আহমদ আলীর ছেলে স্বপন (২৮)। ঘটনাটি ঘটে ১৪ জানুয়ারি (বুধবার) সন্ধ্যায়।
আরও পড়ুন: কাপাসিয়ায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে এলাকার একাংশ প্রথমে দু’জনকে আটক করে। এরপর কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রকাশ্যে শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। চুল কেটে অপমান, জুতার মালা, গাছে বেঁধে রাখা—সবকিছুই চলেছে উৎসুক জনতার সামনে। কেউ কেউ সেই দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ ও লজ্জাজনক করে তোলে।
ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরকীয়া অবশ্যই নিন্দনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কি কোনো সমাজকে দেওয়া হয়েছে? চুল কেটে অপমান করা, গলায় জুতার মালা পরানো, গাছে বেধে রাখা—এসব কি সভ্য সমাজের বিচার পদ্ধতি?
আরও পড়ুন: শরীয়তপুরে কাবিখা–কাবিটা প্রকল্পে হরিলুট, প্রশ্ন করায় সাংবাদিককে কর্মকর্তার হুমকি
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, আমরা সবাই পাপী, আপন পাপের বাটখাড়া দিয়ে অন্যের পাপ মাপি। এই ঘটনায় সেই কথাই যেন নির্মমভাবে সত্য হয়ে উঠেছে।
এলাকার সচেতন মহলের প্রশ্ন পরকীয়া যদি অপরাধ হয়, তাহলে সুদখোরি, জমি আত্মসাৎ, পারিবারিক প্রতারণা কি অপরাধ নয়? একই সমাজে এসব ঘটনা ঘটে, কিন্তু সেগুলোর জন্য কেন এমন প্রকাশ্য শাস্তি দেখা যায় না?
আরও বিস্ময়ের বিষয়, কিছুদিন আগেই একই এলাকায় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে দিব্যি সংসার করছেন। তখন কোথায় ছিল এই তথাকথিত নৈতিকতার পাহারা?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনায় সংঘটিত হয়েছে একাধিক ফৌজদারি অপরাধ: বেআইনি আটক, শারীরিক নির্যাতন, নারীর মর্যাদাহানি, প্রকাশ্যে অপমান, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব আদালতের, জনতার নয়।
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিকার শুধু ওই নারী বা যুবক নন। তাদের সন্তান, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন—সকলকে আজীবন বহন করতে হবে সামাজিক লজ্জা, মানসিক ট্রমা ও নিরাপত্তাহীনতা।
দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ পাঠিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সমাজের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। কাউকে মারধর করা, চুল কেটে অপমান করা সম্পূর্ণ বেআইনি। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের মাধ্যমে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার উবায়দুর রহমান সাহেল বলেন, শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলে দেশের প্রচলিত আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। সামাজিকভাবে কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে চুল কেটে দেওয়া বা মারধর করা নিজেই দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগীরা চাইলে এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা কোন পথে হাটছি—আইনের শাসনের দিকে, নাকি জনতার উন্মত্ততার দিকে? সচেতন মহলের দাবি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, আইন হাতে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীদের আইনি ও মানসিক সুরক্ষা, প্রতিটি অপরাধের বিচার হোক—কিন্তু তা হোক আদালতে, জনতার লাঠি দিয়ে নয়। সভ্য সমাজে মধ্যযুগীয় বর্বরতার কোনো জায়গা নেই।





