পটুয়াখালী মডেল মসজিদের ইমামের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণের মামলা: তদন্তে অভিযোগ ভুয়া প্রমাণিত, বাদী গ্রেপ্তার

Shahrier Islam Pallab
অপূর্ব সরকার, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:১৩ পূর্বাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:২১ পূর্বাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

পটুয়াখালী জেলা মডেল মসজিদের পেশ ইমামসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করে উল্টো নিজেই ফেঁসে গেছেন জাহানারা বেগম (৬৩)। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) নিরপেক্ষ তদন্তে ধর্ষণের অভিযোগের কোনো সত্যতা না পাওয়ায় আদালত মামলাটি খারিজ করেন। একই সাথে মিথ্যা মামলা দায়ের করে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি করার অপরাধে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে আজ ওই তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর পটুয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি (মামলা নম্বর: ৮৬৪/২০২৫) দায়ের করেছিলেন জাহানারা বেগম। মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (২০০৩ সালের সংশোধনীসহ)-এর ৯(৪)(খ) ও ৩০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। জাহানারা বেগমের অভিযোগ ছিল, তার ১২ বছর বয়সী নাতনি নাইমা রাবেয়া মডেল মসজিদে আরবি পড়তে যেত। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর সন্ধ্যার দিকে তাকে মক্তবের পাশের একটি স্টোররুমে নিয়ে মডেল মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মাওলানা মোঃ তানভিরুল ইসলাম (মামলার নথি অনুযায়ী তানভীর হোসেন), খাদেম সাব্বির ও আহমাদুল্লাহ মিলে ধর্ষণ করেন।

আরও পড়ুন: বাউফলে ৪ ককটেল বিস্ফোরণে জনমনে আতঙ্ক

স্থানীয়দের অভিযোগ ও পুলিশি তথ্যমতে, শহরের কলাতলা এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম দীর্ঘদিন ধরে তার দুই নাতিকে দিয়ে পটুয়াখালী জেলা মডেল মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে চুরি ও অপকর্ম করিয়ে আসছিলেন। বিগত ১২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তার দুই নাতি মডেল মসজিদে চুরি করতে ঢুকলে খাদেম সাব্বির ও আলহাজ্ব শাহ আলম (৭০) নামে এক মুসল্লি তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলেন। পরবর্তীতে এশার নামাজের পর বিষয়টি মডেল মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মোঃ তানভিরুল ইসলামকে জানানো হলে তিনি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক এবং সহকারী পুলিশ সুপারকে (সদর সার্কেল) অবহিত করেন।

সংবাদ পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে দুই কিশোরকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। তবে তাদের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার জেরে মসজিদ কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে এবং ইমাম, মোয়াজ্জিন ও খাদেমদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার ১৫ দিন পর হাসপাতালের কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন জাহানারা বেগম।

আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভ

আদালতের নির্দেশে পিবিআই মামলাটির বিস্তারিত তদন্ত শুরু করে। তদন্তকালে সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও হাসপাতালের চিকিৎসকের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ধর্ষণের কোনো সত্যতা কিংবা আলামত পায়নি তারা। তদন্ত শেষে পিবিআই গত ২৯ জুন আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করে, যেখানে পুরো অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৮ জুলাই মামলার শুনানি শেষে বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল (জেলা জজ) মামলাটি খারিজ করে দেন। একই সাথে মিথ্যা মামলা দায়ের করে আদালতকে বিভ্রান্ত করা ও নির্দোষ ব্যক্তিদের সামাজিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করার অপরাধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায়  জাহানারা বেগমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

পটুয়াখালী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে বিবাদীপক্ষ বাদিনী জাহানারা বেগমের বিরুদ্ধে পাল্টামামলা দায়ের করলে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি করেন। উক্ত ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে ২১ সেপ্টেম্বর সদর থানা পুলিশ জাহানারা বেগমকে গ্রেপ্তার করে  আজ ২২ সেপ্টেম্বর আদালতে সোপর্দ করার আইনি প্রক্রিয়া চলছে।