মুন্সীগঞ্জে ৫ বছর ধরে রোগী দেখছেন টেকনিশিয়ান, ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ পরিচয়ে

Shahrier Islam Pallab
মো. নাজির হোসেন, মুন্সীগঞ্জ
প্রকাশিত: ৪:২৩ অপরাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৫:১৫ অপরাহ্ন, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মুন্সীগঞ্জে একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতালের টেকনিশিয়ানের বিরুদ্ধে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতি শনিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের কাঁঠালতলায় তালুকদার ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখছেন তিনি, সরেজমিনে গিয়ে সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তিনি রোগীপ্রতি ৫০ টাকা ফি নিচ্ছেন। চাকরি করছেন মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মানিকপুর এলাকার অবস্হিত বেসরকারি "মানিকপুর ইসলামি চক্ষু হাসপাতাল" টেকনিশিয়ান পদে। 

আরও পড়ুন: অটোচালক জাকারিয়া হত্যা; পরিকল্পনাকারী সাইফুলসহ গ্রেপ্তার ৩

অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে তার ব্যবহৃত ব্যবস্থাপত্র ঘিরে। একাধিক ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের আগে ‘ডা.’ ব্যবহার করে ‘ডা. গাজী মো. মাসুদুর রহমান’ পরিচয় লিখা রয়েছে। ব্যবস্থাপত্রে চক্ষু রোগের বিভিন্ন ওষুধ ও পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি ডি.এম.এফ, ডিসপেনসিভ অপথালমিক (ডিও) প্রশিক্ষণ, ডি.অপথ, রিফ্র্যাকশন অ্যান্ড লো ভিশন কোর্সসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার উল্লেখ রয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, তার মূল কাজ চশমা, লেন্স বিক্রি ও চোখের অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবা দেওয়া। অথচ হাসপাতালের বাইরে নিজস্বভাবে রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—তিনি আদৌ চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখার আইনগত অনুমোদন রাখেন কি না?

আরও পড়ুন: ফটিকছড়িতে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ অভিযান, আটক ৪৫ কিশোর

স্থানীয়রা বলছেন, চোখ মানবদেহের অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। এ ধরনের চিকিৎসায় রোগীর কাছে চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিবন্ধন ও চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা পরিষ্কার থাকা জরুরি। একজন টেকনিশিয়ান চিকিৎসকের পরিচয়ে রোগী দেখলে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

চিকিৎসা নিতে আসা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ লেখা থাকায় স্বাভাবিকভাবেই একজন রোগী তাকে চিকিৎসক মনে করবেন। তার কাছে চিকিৎসা নেওয়ার পর আমার সন্দেহ হয়। পরে জানতে পারি, তিনি চিকিৎসক নন, টেকনিশিয়ান। রোগীদের সঙ্গে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা দরকার।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতি শনিবার নির্দিষ্ট সময়ে তালুকদার ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখলেও বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বেসরকারি একটি চক্ষু হাসপাতালের কর্মী কীভাবে নিয়মিত হাসপাতালের বাইরে রোগী দেখছেন এবং ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ পরিচয় ব্যবহার করছেন।

এদিকে, তালুকদার ফার্মেসির মালিক শাখাওয়াত হোসেন নিজাম বলেন, আমি তো জানি না, সে ডাক্তার নয়। ডাক্তার বলেই আমার ফার্মেসিতে পাঁচ বছর ধরে কাজ করছেন। যদি ডাক্তার না হয়, তাহলে তাকে এখানে রাখব না। তার সাটির্ফিকেট আমি দেখিনি।

অভিযোগের বিষয়ে টেকনিশিয়ান গাজী মো. মাসুদুর রহমান বলেন, মানিকপুর ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে টেকনিশিয়ান পদে চাকরি করেন। আপনি ডাক্তার হিসেবে রোগী দেখতে পারে এ কথায় জবাব নিতে পারেনি তিনি। সে শিকার করেন ফার্মেসিতে দীর্ঘদিন ধরে রোগী দেখছেন। মানিকপুর ইসলামি চক্ষু হাসপাতালের পরিচালকের একজন মো. মজিবুর সরকার বলেন, মাসুদুর রহমান আমাদের ৩ বছর ধরে টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত।এখানে সে ডাক্তার পরিচয় দেয় না এবং তাকে ডাক্তার হিসেবে আমরা রাখিনি। কোথাও ডা. পরিচয়ে রোগী দেখেন জানি না। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি তদন্ত করে ওই ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা, চিকিৎসা দেওয়ার অনুমোদন, পেশাগত নিবন্ধন এবং ব্যবস্থাপত্রে ‘ডা.’ পরিচয় ব্যবহারের বৈধতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালের একজন টেকনিশিয়ান হিসেবে তিনি হাসপাতালের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে রোগী দেখার অনুমতি রাখেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. সাজেদা বেগম মুঠোফোন বলেন, এ ঘটনাটি আমার জানা ছিলো না, এখন জানলাম। তদন্ত সাপেক্ষ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। ডাক্তার না হয়ে কেউ ব্যবস্হাপত্র বা চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন না। 

স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে চিকিৎসকের পরিচয় নিয়ে রোগীদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ না থাকে।