চট্টগ্রামে ‘কিশোর গ্যাং’ নেতা বগাকে ধরতে নগর ভবনে অভিযানের পর ওসি বদলি

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৬:২৮ অপরাহ্ন, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৬:২৮ অপরাহ্ন, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রাম নগরের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে নগর ভবনে পুলিশের বাধার মুখে পড়ার ঘটনার পর খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিমকে বদলি করা হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় আবদুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে নগর বিশেষ শাখায় (সিটি এসবি) সংযুক্ত করা হয়। তবে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এটিকে নিয়মিত বদলি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মাত্র এক মাস ১০ দিন আগে খুলশী থানায় যোগ দেওয়া ওসিকে বদলির ঘটনায় পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: রংপুরে একই পরিবারের চার খুন: ডিএনএ পরীক্ষায় সিদ্ধার্থ-মুগ্ধের নমুনা শনাক্ত

এর আগে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ওয়াকিল নগর ভবনে অবস্থান করছেন—এমন খবর পেয়ে খুলশী থানা পুলিশ নগরের টাইগারপাস এলাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে যায়। পুলিশ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে অভিযানে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেও ওয়াকিলকে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ ফিরে যায়।

ওয়াকিল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি সিটি মেয়রের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রায় তিন মাস আগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পুলিশ বলছে, অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ওয়াকিলের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে।

আরও পড়ুন: উলিপুরে নজরুল বর্ষ ২০২৬ উপলক্ষে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান

নগর ভবনে পুলিশের অভিযানের পরদিন নগরের ঈদগাঁহ রূপসা বেকারি এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।

মেয়র অভিযোগ করেন, আবদুর রহিম পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ওয়াকিলকে তিনি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী হিসেবে মনে করেন না বলেও মন্তব্য করেন।

শাহাদাত হোসেনের দাবি, ওয়াকিল গত ১৭-১৮ বছর বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনেও অংশ নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে ১৭০ থেকে ১৮০টি মামলা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন মেয়র।

ওসি আবদুর রহিমের বিষয়ে মেয়র বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বাকলিয়া থানার ওসি ছিলেন। তখন তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। খুলশী থানায় যোগ দেওয়ার পরও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো যুবলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, অথচ ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ হৃদয় হত্যার মামলাকে কেন্দ্র করেও ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন মেয়র। তাঁর দাবি, মামলার এক আসামিকে মারধর করে ওয়াকিল ও তাঁর ভাইয়ের নাম বলানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ওয়াকিলকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মেয়র বলেন, ওয়াকিল তাঁর কাছে আসেননি; তাঁর দুই ভাই অভিযোগ নিয়ে তাঁর কাছে এসেছিলেন। কেউ মামলার আসামি বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত হলে তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মেয়রের গাড়িতে করে ওয়াকিল নগর ভবন থেকে বের হয়েছেন—এমন প্রচারও অস্বীকার করেন শাহাদাত হোসেন। তাঁর দাবি, সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এসব প্রচার করা হচ্ছে।

মেয়রের অভিযোগের বিষয়ে আবদুর রহিম বলেন, তিনি ছুটিতে ছিলেন এবং নগর ভবনে পুলিশের অভিযানের বিষয়ে তিনি জানেন না।

তিনি জানান, খুলশী থানার ওসি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর এক কলেজশিক্ষককে মারধরের মামলায় ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই সময় ওয়াকিলের লোকজন পুলিশের ওপর হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে বলে দাবি করেন তিনি।

আবদুর রহিম আরও বলেন, ১৬ বছর বয়সী হৃদয় হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।

চাপে পড়ে বদলি হয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। কর্তৃপক্ষ যখন যেখানে দায়িত্ব পালন করতে দেবেন, সেখানে করব।’

নগর ভবনে পুলিশের অভিযানের পরদিনই ওসিকে বদলি করা হয়েছে—এ বিষয়ে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ওসির বদলি রুটিনমাফিক হয়েছে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো রাজনৈতিক নেতার অভিযোগের পর একজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হলে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ওয়াকিলের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে।

গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগে খুলশী থানায় একটি মামলা হয়। ওই মামলায় ওয়াকিলকে আসামি করা হয়। মামলা নেওয়ার কারণে ওসি আবদুর রহিমকে ‘আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে তাঁকে মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ওসি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

এরপর ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানায়। এতে ওসি আবদুর রহিমসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় ওয়াকিলকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

তবে ওই অভিযানে পুলিশের বিরুদ্ধে পরে আদালতে মামলা করেন ওয়াকিলের বাবা। তাঁর অভিযোগ, ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে পুলিশ তাঁদের বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করেছে। এতে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।

এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়্যারলেস কলোনিতে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের বিরোধে হৃদয় নিহত হন। এ ঘটনায় করা মামলায়ও ওয়াকিলকে আসামি করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওয়াকিলের গ্রুপ ‘সেভেন স্টার’ এবং খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেনের গ্রুপ ‘ফাইভ স্টার’-এর বিরোধের জেরেই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার প্লট দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে ওয়াকিলসহ ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে খুলশী থানায় আরেকটি মামলা করা হয়। এতে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করেছেন ‘চট্টগ্রাম খবর’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মুহাম্মদ আরিফ।

ওয়াকিলের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তাঁর ভাই নগর ছাত্রদলের সদস্য রকি হোসেন পিচ্চি দাবি করেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে একটি পক্ষ তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

অন্যদিকে মামলার বাদী শেখ মুহাম্মদ আরিফ বলেন, ওয়াকিলের কারণে খুলশী ও আকবর শাহ এলাকার মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। একই সঙ্গে একজন কিশোর গ্যাং নেতার প্রতি মেয়রের এমন অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।