গ্যাসহীন শহর, গল্পবাজ রাষ্ট্র আর জিম্মি নাগরিক
ছয় দিন ধরে বাসায় গ্যাস নেই। একেবারেই নেই। চুলা জ্বলে না, হাঁড়িতে ভাত বসে না, শিশুর খাবার তৈরি হয় না। শুনতে ছোট সমস্যা মনে হলেও, এই গ্যাসহীনতা একটি শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অচল করে দেয়। গত ২২ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এমন পরিস্থিতি দেখার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। এটি কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা তিন কোটি মানুষের মেগাসিটি। এখানে গ্যাস মানে শুধু রান্না নয়- গ্যাস মানে সময়, কর্মজীবনের শৃঙ্খলা, পরিবার টিকে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা। অথচ সেই শহরেই দিনের পর দিন মানুষ গ্যাসহীন। এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পনাহীনতা ও দায়হীনতার ধারাবাহিক ফল।
আরও পড়ুন: ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের ছক: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম নতুন বিশ্বব্যবস্থা
সরকারি ব্যাখ্যার কোনো অভাব নেই। কখনো বলা হচ্ছে নোঙরের আঘাতে গ্যাস লাইনের পাইপ ফুটো হয়েছে, কখনো বলা হচ্ছে পাইপলাইনে পানি ঢুকে গেছে, কখনো আবার শোনা যায় গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভালভ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিবারই নতুন গল্প হাজির হয়। কিন্তু গল্প বদলালেও বাস্তবতা বদলায় না- চুলা নিভে থাকে, মানুষ ভোগে।
বাস্তব তথ্য আরও নির্মম। দৈনিক চাহিদার তুলনায় দেশে গ্যাস উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। এলএনজি আমদানি সীমিত- ডলার সংকট, নীতিগত গড়িমসি আর দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থ সিদ্ধান্তের কারণে। অর্থাৎ এই সংকট হঠাৎ আসা কোনো দুর্যোগ নয়, এটি বহু আগেই অনুমেয় ছিল। সতর্কবার্তা ছিল, তবু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: জিম্মি একটি জাতি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরাধ ও অযোগ্যতার ভয়াবহতা
এই পরিস্থিতিতে সরকার কার্যত নাগরিকদের ঠেলে দিয়েছে বিকল্প জ্বালানির দিকে- এলপিজি। কিন্তু এখানেই সংকটের দ্বিতীয় ও আরও ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হয়।
দেশে এখন মূলত এলপিজি সংকট চলছে। শুধু সরবরাহ ঘাটতি নয়, চলছে কৃত্রিম সংকট। সরকার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে- প্রতি সিলিন্ডার ১৩১০ টাকা। এই মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে লুটপাট থেকে রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে সেই সিদ্ধান্ত কাগজেই সীমাবদ্ধ।
মাঠের চিত্র ভিন্ন। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্য অমান্য করে এলপিজি সিলিন্ডার স্টক করে রেখেছে। সংকটের সুযোগ নিয়ে তারা গ্রাহকদের জিম্মি করছে। আজ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একটি সিলিন্ডার কিনতে গেলে গুনতে হচ্ছে ২০০০ থেকে ২২০০ টাকা। কোথাও আবার আরও বেশি।
এটি কোনো বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, এটি প্রকাশ্য আইন অমান্য। গ্রাহকের সামনে কোনো বিকল্প নেই। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ দিয়ে রান্না সম্ভব নয়, হোটেলে খাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ এই অতিরিক্ত দাম দিয়েই সিলিন্ডার কিনছে। এটিকে ব্যবসা বলা যায় না, এটি সরাসরি জিম্মিদশা।
প্রশ্ন হলো, এই স্টক কারা করছে? কীভাবে তারা দিনের পর দিন সিলিন্ডার গুদামজাত করে রাখছে? প্রশাসন কি জানে না? নাকি দেখেও না দেখার ভান করছে?
রাষ্ট্র যদি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অন্তত বিকল্প জ্বালানির বাজার নিয়ন্ত্রণ করা তার ন্যূনতম দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্বও পালন করা হচ্ছে না। ফলে একদিকে মানুষ গ্যাসহীন, অন্যদিকে এলপিজি কিনতে গিয়ে দ্বিগুণ দাম দিতে বাধ্য হচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপ মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষকে নিঃশব্দে পিষে দিচ্ছে।
তিতাস গ্যাস নিয়মিত দুঃখ প্রকাশ করছে। বিজ্ঞপ্তি আসছে, “শিগগিরই সমস্যা সমাধান হবে”- এই আশ্বাসও নতুন নয়। কিন্তু দুঃখ প্রকাশ দিয়ে কি চুলা জ্বলে? দুঃখ প্রকাশ দিয়ে কি এলপিজির কালোবাজার বন্ধ হয়? রাষ্ট্র যদি কেবল বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জবাবদিহি শব্দটি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই সংকটের মানবিক দিক সবচেয়ে অবহেলিত। রাজধানীর পূর্ব দোলাইপাড়ের একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে- খাবারের জন্য শিশুমনের অপেক্ষা। এটি কোনো প্রতীকী ছবি নয়, এটি শহরের হাজারো পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা। গ্যাস নেই, সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য নেই, শিশুরা অপেক্ষা করছে। এই অপেক্ষা শুধু ক্ষুধার নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি এক নীরব অভিযোগ।
আমরা বারবার সাধুকে চেয়ারে বসাই। আশা করি, এবার হয়তো কিছু বদলাবে। কিন্তু পর্দা খুললে দেখা যায়, চেয়ারে বসে আছে সেই পুরোনো শয়তান- দায়হীনতা, অব্যবস্থাপনা আর ক্ষমতার অহংকার। মুখ বদলায়, নাম বদলায়, কিন্তু আচরণ বদলায় না।
রাষ্ট্রের কাজ গল্প বলা নয়। রাষ্ট্রের কাজ সেবা নিশ্চিত করা। পাইপলাইনে সমস্যা হতেই পারে, যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটতেই পারে। কিন্তু দিনের পর দিন যদি একই সংকট চলতে থাকে, যদি বিকল্প ব্যবস্থাও লুটপাটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি আর দুর্ঘটনা নয়- সেটি নীতিগত ব্যর্থতা।
এই ব্যর্থতার দায় কি কেউ নেবে? সরকার কি স্পষ্ট করে বলবে, কেন গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ ছিল? কেন এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অভিযান নেই? কেন সরকার নির্ধারিত ১৩১০ টাকার সিলিন্ডার ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে- এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?
ইতিহাস বলে, মানুষ সব সহ্য করলেও একসময় প্রশ্ন তোলে। ক্ষুধা, কষ্ট আর অবহেলা জমতে জমতে সেই প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
গ্যাস সংকটের সমাধান শুধু পাইপ মেরামত নয়। এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন- রাষ্ট্র কার পক্ষে দাঁড়াবে? নাগরিকের নাকি মুনাফালোভীদের?
ঢাকা শহর গ্যাসহীন থাকতে পারে না। তিন কোটি মানুষের জীবনকে পরীক্ষাগারে পরিণত করা কোনো উন্নয়ন নয়। উন্নয়ন মানে শুধু ভবিষ্যতের মেগা প্রকল্প নয়, উন্নয়ন মানে আজকের রান্নাঘরের আগুনটুকুও।
গ্যাসহীন শহর আর দ্বিগুণ দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হওয়া মানুষ আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন রেখে যায়- এই রাষ্ট্র কি নাগরিকের কষ্ট বোঝে, নাকি সংকটকেই ব্যবসার সুযোগ হিসেবে ছেড়ে দিয়েছে?
লেখক: কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী।





