গণভোট ২০২৬: রাষ্ট্র যখন নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারক

Sadek Ali
ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ৫:৩৪ অপরাহ্ন, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৬:৫১ অপরাহ্ন, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। একদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে চারটি মৌলিক প্রশ্নে ঐতিহাসিক ‘গণভোট’। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণভোট হলো জনমত যাচাইয়ের শ্রেষ্ঠতম পন্থা। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে গত কয়েকদিনে অন্তর্বর্তী সরকারের যে ‘একতরফা’ সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে, তা জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার কি গণভোটে কোনো সুনির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালাতে পারে?

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক ও এক্স হ্যান্ডলে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেছেন, যেখানে সরাসরি বলা হয়েছে, ‘দেশকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলে দিন, ‘হ্যাঁ’তে সিল দিন।’ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, এই প্রচারণা ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভিডিওচিত্রে ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না, এমন এক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা নাগরিকদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করার শামিল।

আরও পড়ুন: ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের ছক: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম নতুন বিশ্বব্যবস্থা

একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও প্রধান নৈতিক দায়িত্ব হলো ‘রেফারি’ বা আম্পায়ারের ভূমিকা পালন করা। যখন সরকার নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কোমর বেঁধে মাঠে নামে, তখন মাঠের সমতা বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কারগুলো (যেমন: দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা) নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সংস্কারগুলোর ভালো-মন্দ বিচার করার ভার জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ছিল প্রকৃত গণতন্ত্র। রাষ্ট্র যখন নিজেই একটি পক্ষের ‘মার্কেটিং এজেন্ট’ হয়ে যায়, তখন বিপরীত মত বা ‘না’ ভোটের সুযোগটি সংকুচিত হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই প্রচারণায় প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোর ব্যবহার। ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে। এমনকি ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় ব্যানার টাঙানোর নির্দেশ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি কি আমানতকারীদের অর্থ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার ওপর আঘাত নয়? যারা ভোট গ্রহণ করবেন- সেই ডিসি, ইউএনও বা প্রিজাইডিং অফিসাররা যদি আগে থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের নির্দেশনার মধ্যে থাকেন, তবে ভোটের দিন তারা কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের মতো বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন: জিম্মি একটি জাতি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরাধ ও অযোগ্যতার ভয়াবহতা

সরকার প্রচার করছে যে ‘না’ ভোট দেওয়া মানেই প্রাপ্তিহীনতা বা ফ্যাসিবাদের দিকে ফেরা। এই ধরণের ‘ভয়ের রাজনীতি’ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। সংস্কার হতে হবে স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতিতে, প্রশাসনিক চাপে নয়। 

বিএনপি যেখানে বলছে, প্রচারণার দায়িত্ব সরকারের নয় বরং জনগণের ওপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া উচিত, সেখানে সরকার কেন এতটা মরিয়া? যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়ও, তবে এই একতরফা প্রচারণার কারণে ভবিষ্যতের কোনো আদালত বা রাজনৈতিক শক্তি এই গণভোটের বৈধতাকে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

আমরা একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে জুলাই বিপ্লব দেখেছি। সেই নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্র হবে নিরপেক্ষ অভিভাবক, কোনো পক্ষের প্রচারক নয়। প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর উচিত ছিল গণভোটের প্রশ্নগুলো জনগণের সামনে খোলাসা করা এবং ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যখন নিজেই একটি পক্ষের ‘চ্যাম্পিয়ন’ হয়ে যায়, তখন জনগণের রায় তার নৈতিক ওজন হারায়। জোর করে বা প্রচারণার তোড়ে ‘হ্যাঁ’ জয়ী করা সহজ, কিন্তু জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সরকারকে মনে রাখতে হবে, তাদের কাজ পথ তৈরি করে দেওয়া, কাউকে জোর করে নির্দিষ্ট পথে ঠেলে দেওয়া নয়।


লেখক:ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী