পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি সমঝোতা: মুসলিম বিশ্বের পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতির সূচনা?

Any Akter
কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশিত: ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, ০৯ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

"ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি চুক্তি কেবল দুই বা তিনটি রাষ্ট্রের পারস্পরিক সমঝোতা থাকে না; বরং একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক যুগের সূচনা করে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা সেই ধরনের একটি ঘটনা, যা শুধু মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিকেই নয়, বরং ভারত মহাসাগর, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের শক্তির ভারসাম্যকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।"

বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ এই ত্রিপাক্ষিক সম্পর্ককে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ তিনটি রাষ্ট্র তিনটি ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে।

আরও পড়ুন: পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়নে সেনাবাহিনীর অবদান

পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র;

তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি;

আরও পড়ুন: ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্রে বাংলাদেশ: আত্মমর্যাদা, বাস্তববাদ ও কূটনীতির নতুন অধ্যায়

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি ও বিনিয়োগ কেন্দ্র।

এই তিন শক্তির মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় কেবল সামরিক সহযোগিতা নয়; এটি একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত।

ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া

পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্পর্ক নতুন নয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সৌদি আরব ও তুরস্ক ছিল তার ঘনিষ্ঠ অংশীদার। স্নায়ুযুদ্ধের সময় তিন দেশই বিভিন্ন মাত্রায় পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

তবে একবিংশ শতাব্দীতে তাদের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায় তিনটি কারণে—

১. মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের ধীরে ধীরে পুনর্বিন্যাস;

২. চীনের অর্থনৈতিক উত্থান;

৩. মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি লিখেছিলেন— “Civilizations are not destroyed by external enemies alone; they decline when they fail to adapt.”

মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের জন্য এই ত্রিপাক্ষিক সমীকরণকে অনেক বিশ্লেষক সেই অভিযোজনেরই অংশ হিসেবে দেখছেন।

ভূগোল: তিন মহাদেশের সংযোগস্থলে এক কৌশলগত ত্রিভুজ যদি মানচিত্রে একটি ত্রিভুজ আঁকা হয়—

পশ্চিম প্রান্তে থাকবে তুরস্ক, দক্ষিণে সৌদি আরব, পূর্বে পাকিস্তান।

এই ত্রিভুজের ভেতরে রয়েছে- বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি রুট,হরমুজ প্রণালী,লোহিত সাগর,আরব সাগর,ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বার, ইউরোপ–এশিয়া করিডর।

ব্রিটিশ ভূ-রাজনীতিবিদ স্যার হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডারের বিখ্যাত তত্ত্ব অনুসারে, ইউরেশিয়ার সংযোগস্থল নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলোই দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।

পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি সমন্বয় সেই ইউরেশীয় সংযোগস্থলেরই একটি নতুন রূপ।

অর্থনীতি: পেট্রোডলার, শিল্প ও কৌশলগত করিডরের মিলন

তিন দেশের অর্থনৈতিক শক্তি পরস্পরের পরিপূরক।

রাষ্ট্র প্রধান শক্তি

সৌদি আরব জ্বালানি ও বিনিয়োগ

তুরস্ক প্রতিরক্ষা শিল্প ও উৎপাদন

পাকিস্তান জনশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান ও করিডর

সৌদি আরবের বিপুল পুঁজি, তুরস্কের দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান একত্রে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে।

তুরস্কের Bayraktar ড্রোন, সৌদির Vision 2030 প্রকল্প এবং পাকিস্তানের CPEC করিডর ভবিষ্যতে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অক্ষের ভিত্তি হতে পারে।

সামরিক বাস্তবতা: মুসলিম বিশ্বের নতুন প্রতিরক্ষা স্থাপত্য?

তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য।

পাকিস্তান: পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র;

তুরস্ক: ন্যাটোর অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী;

সৌদি আরব: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা বাজেট।

এখানেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আগ্রহ।

কারণ এই সহযোগিতা যদি দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা স্থাপত্যে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে।

বিশ্বের সেরা জার্নাল ও থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের মূল্যায়ন

Brookings Institution

ব্রকিংসদের মতে, তুরস্ক বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে “Regional Balancer” হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। অর্থাৎ, একক আধিপত্য নয়; বরং বহু-পাক্ষিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হতে চায়।

Chatham House

চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চল, তুরস্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নতুন কৌশলগত সংযোগ আগামী দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রবণতা হতে পারে।

RAND Corporation

র‌্যান্ড কর্পোরেশনের বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

Foreign Affairs

ফরেন অ্যাফেয়ার্স দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেরাই নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি সমীকরণ সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি

এই ত্রিপাক্ষিক সমীকরণকে তিনটি বড় শক্তি ভিন্নভাবে দেখছে।

চীন এটিকে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভাগাভাগির একটি সম্ভাব্য মডেল হিসেবে পর্যবেক্ষণ করবে।

ভারত স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের আলোকে বিষয়টি মূল্যায়ন করবে।

মুসলিম বিশ্বের জন্য এর তাৎপর্য

যদি এই সহযোগিতা স্থায়ী হয়, তবে—

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে যৌথ উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়—

ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন

এই সমীকরণকে দুর্বল করতে পারে।

উপসংহার: একটি নতুন অক্ষের জন্ম, নাকি কেবল কৌশলগত সুবিধাবাদ?

পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি সম্পর্ককে কেবল সামরিক সহযোগিতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে তিনটি ভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল—দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-এশিয়ার সংযোগস্থল—কে এক সুতোয় গাঁথার প্রচেষ্টা।

হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ এখানে প্রাসঙ্গিক— “No nation has friends, only interests.”

প্রশ্ন হচ্ছে, এই তিন রাষ্ট্র কি তাদের স্বার্থকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপ দিতে পারবে?

যদি পারে, তাহলে এটি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পুনর্বিন্যাসগুলোর একটি হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।

আর যদি না পারে, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে আরেকটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু অপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক স্বপ্ন হিসেবেই থেকে যাবে।

লেখক পরিচিতি: কাজী জিয়া উদ্দিন।লেখক, কলামিস্ট ও দাবেক ডিআইজি