বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে: গণ-অভ্যুত্থান থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পথে

Sadek Ali
এম এ মতিন
প্রকাশিত: ৫:২৩ অপরাহ্ন, ২১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩৪ অপরাহ্ন, ২১ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইতিহাস খুব কম জাতিকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নতুন করে গড়ে তোলার দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। বাংলাদেশ আজ ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতনের ঘটনা নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, বৈষম্য এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক গণজাগরণ। কিন্তু আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো যে ,আমরা কি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চাই, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতির মৌলিক পরিবর্তন চাই?

ইতিহাস আমাদের শেখায়, বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা অনেক কঠিন। ফ্রান্স থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব ইউরোপ সব জায়গাতেই দেখা গেছে, গণ-আন্দোলনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করেছে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর। কারণ ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই একটি জাতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

আরও পড়ুন: হুমায়ূন আহমেদের শেষ অভিমান: ফিনিক ফোটা জোছনা ও সৃষ্টির হাহাকার

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরেছে। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা হারিয়েছে। সংসদ অনেক সময় আইন প্রণয়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিচার বিভাগকে ঘিরে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনে মেধা ও পেশাদারিত্বের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলস্বরূপ রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের বিশ্বাসও দুর্বল হয়েছে।

এখন সময় এসেছে এই ভাঙা আস্থাকে পুনর্গঠনের।

আরও পড়ুন: হুমায়ূন আহমেদের শেষ অভিমান: ফিনিক ফোটা জোছনা ও সৃষ্টির হাহাকার

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বিচার যেন কোনো ব্যক্তি, দল বা ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল না হয়। বিচার বিভাগকে হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, দক্ষ ও নিরপেক্ষ। বিচারপ্রার্থীরা যেন রাজনৈতিক পরিচয় নয়, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা পান এবং এটাই হতে হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি।

একইভাবে প্রশাসনকে হতে হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জনবান্ধব। নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে একমাত্র যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, সরকার পরিবর্তনের পরও যার পেশাগত দায়িত্বে কোনো পরিবর্তন আসে না।

নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারও আজ সময়ের দাবি। জনগণকে এমন একটি নির্বাচনী পরিবেশ দিতে হবে যেখানে প্রতিটি ভোটের মূল্য সমান হবে এবং ফলাফল নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ থাকবে না। একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

তবে শুধু অবাধ নির্বাচনই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে “বিজয়ী সবকিছু পাবে” এই সংস্কৃতি সমাজকে বিভক্ত করেছে। লক্ষ লক্ষ ভোটার কার্যত সংসদে কোনো প্রতিনিধিত্ব পান না। ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হয়।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের উচিত একটি জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা। বিশ্বের বহু সফল গণতন্ত্রে এই পদ্ধতি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সমঝোতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। এটি কোনো যাদুকরী সমাধান নয়, কিন্তু জাতীয় ঐক্য গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অবকাঠামো, দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে আড়াল করা যায় না। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক স্লোগান নয়; তারা আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান দেখতে চান।

দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় অন্তরায়। এটি শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঘটায় না; এটি মেধা, উদ্যোক্তা-মানসিকতা এবং জনগণের আস্থাকেও ধ্বংস করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল বক্তৃতা দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, ডিজিটাল সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, সম্পদের স্বচ্ছ ঘোষণা, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা এবং কার্যকর সংসদীয় নজরদারি।

শিক্ষা খাতেও মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের যুগে প্রবেশ করেছে। অথচ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক অংশ এখনও পুরোনো চিন্তা ও নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশকে যদি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়, তবে শিক্ষানীতিকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হবে।

একইভাবে স্বাস্থ্যসেবাকেও একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, আধুনিক অবকাঠামো, সুশাসন এবং জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্য প্রশাসন।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি দেশের তরুণ প্রজন্ম। জুলাইয়ের আন্দোলন প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের যুবসমাজ আর নীরব দর্শক নয়। তারা পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। তবে আন্দোলনের শক্তিকে এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতায় রূপান্তর করতে হবে। প্রতিবাদ থেকে নীতি নির্ধারণে, স্লোগান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং আবেগ থেকে দায়িত্বশীল নেতৃত্বে উত্তরণই হবে নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকেও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সরকারকে সমর্থন বা বিরোধিতা নয়, বরং নীতিনিষ্ঠ সমালোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান ভূমিকা।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি কখনোই শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে না। ব্যক্তি আসবে, ব্যক্তি চলে যাবে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক হয়, তবে কোনো সরকারই সহজে গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে পারবে না।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ যদি আমরা শুধু ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ রাখি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। কিন্তু যদি আমরা বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, সংসদ, স্থানীয় সরকার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে পারি, তবে এই গণ-অভ্যুত্থান একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।

আজ প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়; প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের রাজনীতি। প্রয়োজন ব্যক্তি-নির্ভর রাষ্ট্র থেকে আইন-নির্ভর রাষ্ট্রে উত্তরণ। প্রয়োজন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়; বরং জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশ আজ সত্যিই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে,একটি পথ আমাদের আবারও অতীতের রাজনৈতিক সংঘাত, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে; অন্যটি আমাদের নিয়ে যাবে একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক এবং আধুনিক রাষ্ট্রের দিকে।

ইতিহাস এই প্রজন্মকে বিচার করবে কেবল তারা একটি সরকার পরিবর্তন করেছে কি না, তা দিয়ে নয়; বরং তারা এমন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছে কি না, যা আগামী প্রজন্মের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখবে।

গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য ক্ষমতার পরিবর্তনে নয় বরং প্রতিষ্ঠানের পুনর্জাগরণে। আর সেই পুনর্জাগরণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি নতুন, শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

লেখক:  এম এ মতিন