নতুন সমীকরণে কওমিভিত্তিক ইসলামী দলগুলো

সতর্ক বিএনপি, টেনশনে জামায়াতে ইসলামী

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৫৮ অপরাহ্ন, ২১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৭:৫৮ অপরাহ্ন, ২১ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতে যায়নি জমিয়ত, কওমিভিত্তিক দলগুলোর ১১ দলীয় জোট ছাড়ার চাপ হেফাজতের।

হেফাজতের নিয়ন্ত্রণে আগামী মাসে আসছে কওমিভিত্তিক ইসলামী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ নতুন প্ল্যাটফর্ম।

আরও পড়ুন: দেশে থামছে না হামের প্রাদুর্ভাব, আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

দেশের শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হেফাজতে ইসলামের নিয়ন্ত্রণে আবারও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে ইসলামী দলগুলো। ৫ আগস্টের পর আসন ভাগাভাগি ও নির্বাচনী জোটে যাওয়া প্রশ্নে বহুধাবিভক্ত ইসলামী দলগুলো নানাভাবে বঞ্চিত হয়ে আবারও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ কারণে অকার্যকর হয়ে পড়া হেফাজতে ইসলাম কওমিভিত্তিক দলগুলোকে এক জোট হয়ে কাজ করার উদ্যোগকে সর্বস্তরের আলেম-ওলামারা সমর্থন করায় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সর্ববৃহৎ এই ধারার দলগুলোর একজোট হওয়ার প্রেক্ষাপটে টেনশন বেড়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট ভাঙনের।

রাজনৈতিক নতুন সমীকরণের আভাসে আগেভাগেই নড়ে-চড়ে বসেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে শুভেচ্ছা ডিনারের মাধ্যমে শরিকদের সঙ্গে সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর শুভেচ্ছা বিনিময় করে ডিনার করেন। নির্বাচনী জোটের শরিক জমিয়তে উলামা ইসলামের কেউ এতে যোগ দেননি। গণঅধিকার থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে পরাজিত হওয়া রাশেদ খানকে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাসদ (রব) ও মান্নার বক্তব্যের ঐক্য প্রক্রিয়া আগেই বিএনপি থেকে বেরিয়ে গেছে। বিএনপি এখন শরিকদের কাছে টানার চেষ্টা করছে।

আরও পড়ুন: শান্তি ও যুদ্ধাবস্থায় আনসার-ভিডিপির ভূমিকা তুলে ধরলেন মহাপরিচালক

স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পাশাপাশি এখানে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসিতে হেফাজতে ইসলামকে দুর্বল করে বিভক্ত করে রাখা হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। কওমিভিত্তিক নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সাতটি দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদ্যোগে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর বাইরে হেফাজতে ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন শক্তি হয়ে আবির্ভূত হতে চাচ্ছে ইসলামী দলগুলো।

হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নতুন একটি রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে। শুধু তাই নয়, আগামীতে নিজেদের শক্তি বাড়াতে নতুন সমীকরণ নিয়ে সামনে এগোচ্ছে কওমি ধারার ধর্মভিত্তিক দলগুলো। তবে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই ঐক্য প্রক্রিয়া দেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে।

তবে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সাতটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নিয়ে উদ্যোগ হেফাজতে ইসলাম নিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দল জামায়াতে ইসলামীর জোটে এবং একটি বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। এরই মধ্যে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, উদ্যোগটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে এখনকার বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা এ ধরনের দলগুলোর জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। কওমিভিত্তিক মুরুব্বিরা মামুনুল হকসহ ইসলামী দলগুলোর নেতাদের জামায়াত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চাপ দিচ্ছেন। নতুন ইসলামী জোট হলে জমায়াত ও বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে আসার সম্মতি দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার লক্ষ্য নিয়ে একটি জোট গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই এবং জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকেই এ উদ্যোগটি তখন নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বরিশালের চরমোনাইয়ে গিয়ে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’-এর ঘটনা তখন ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল। মূলত এর ধারাবাহিকতাতেই নির্বাচনে আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করেছিল জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ইসলামী দল। কিন্তু পরে নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির দিক থেকে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাসখানেক আগে চলতি বছরের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত তারা আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়।

কওমি ধারার দলগুলোও এই নির্বাচনে মূলত তিন ভাগ হয়ে অংশ নিয়েছে। এতে জামায়াতে ইসলামীর জোটে থেকে যায় খেলাফত মজলিসের দুই অংশ ও নেজামে ইসলাম। আর বিএনপির সঙ্গে গিয়ে চারটি আসনে বিএনপির সমর্থন পায় জমিয়ত উলামায়ে বাংলাদেশ। সংসদে এখন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুজন এবং খেলাফত মজলিসের একজন সদস্য আছেন। দুটি দলই জামায়াতের জোটে আছে। এই জোটে থাকা অন্য দল নেজামে ইসলামের কাউকে নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি। হেফাজতে ইসলামের অন্যতম নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলছেন, দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতের আমির চান কওমি ঘরানার দলগুলো এক ছাতার নিচে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনীতি করুক এবং ধর্মীয় ও জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে সমন্বিতভাবে ভূমিকা রাখুক। এ লক্ষ্যে তিনি বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলের কাছে লিখিত প্রস্তাব চেয়েছেন। ঐক্যের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোতে পারে, সে বিষয়ে মতামতও আহ্বান করেছেন। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে আগামী আগস্টের শুরুতে আবার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে সম্ভাব্য ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নেতৃত্বের কাঠামো নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে মতবিনিময়সহ এসব আলোচনা হয়েছে। তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলগুলোকে বলা হয়েছে, নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনার পর ঐক্যের রূপরেখা দিতে। আগস্টের বৈঠকে তা উত্থাপন করা হবে। ওই দিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও ছিল। বিএনপির জোটে থাকা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও ছিল। ছিল জামায়াতের জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত মজলিস। জামায়াতের জোট থেকে সম্প্রতি বেরিয়ে যাওয়া খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। চরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী আন্দোলন বাদে বাকি ছয়টি দল আগে থেকেই হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত। এই দলগুলোর নেতারা হেফাজতের পদধারী নেতা।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করেন অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের নেতারা। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা জামায়াতকে জোট দেওয়া হারাম বলেও ফতোয়া জারি করেন। তবে এতে জোট ছাড়েনি জামায়াতের সঙ্গে থাকা দেওবন্দি উসুলে পরিচালিত দলগুলো।

মাদ্রাসা নিয়ে বিরোধ থেকে ঐক্যের উদ্যোগ: হেফাজত এবং দলগুলোর নেতারা বলেছেন, কওমি ঘরানার দলগুলো নানা জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ায় মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ মাদ্রাসা নিয়ে জমিয়তের দুই পক্ষের বিরোধ তৈরি হয়। এতে জড়িয়ে যায় জামায়াতও। তবে একাধিক নেতা বলেছেন, জমিয়ত বিএনপির সঙ্গে থাকায় এবং কয়েকটি দল জামায়াতের সঙ্গে থাকায় আলেম-ওলামাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বাহাস হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতায় জামায়াত ছাড়ার পর তাদের সঙ্গে বিরোধ হচ্ছে অন্যদের।

ঐক্যের জন্য চলতি মাসের শুরুতে রাবেয়াতুল ওয়াজিনের ব্যানারে রাজধানীতে সম্মেলন হলেও মঞ্চেই বিরোধ তৈরি হয় বিএনপি ও জামায়াত প্রশ্নে। দেওবন্দের অনুসারী কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই সাত দল জামায়াতের অনুসরণ করা মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে। দেওবন্দ ধারার দলগুলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিদের সত্যের মাপকাঠি তথা সমালোচনার ঊর্ধ্বে বলে মনে করেন। তাই প্রায় আট দশক ধরে জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামী দলের বিরোধ চলছে।

বৈঠকে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা দলগুলোকে সতর্ক করে বলেন, জামায়াতের আকিদা ঢুকে যাচ্ছে মাদ্রাসায়। এরপর নিয়ন্ত্রণও চলে যাবে। তাই আকিদা ও মাদ্রাসা রক্ষায় কওমি ধারার দলগুলোকে একসঙ্গে থাকতে হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন জোট করে জামায়াতের সঙ্গে। প্রথম তিনটি দলকে জামায়াত আসন ছাড়লেও খেলাফতকে ছাড়েনি। এককভাবে ভোট করা এই দলটি নির্বাচনের পর জোট ছেড়েছে। দলটিকে জামায়াত উচ্চকক্ষে আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। উচ্চকক্ষ অনিশ্চিত হওয়ায় তারা একাই পথ চলতে চায়। বাংলাদেশ খেলাফত দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়ী হয়েছে। কোনো আসনে জিততে পারেনি নেজামে ইসলাম। খেলাফত মজলিস সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট না ছাড়লেও তারা ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে যাবে না। ফলে দলটি আর নেই জামায়াতের সঙ্গে।

নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার জমিয়তকে গুরুত্ব দিচ্ছে না—এ অভিযোগ তুলে দলটির নেতারা বারবার ক্ষোভ জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, তারা নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে না থাকলে ইসলামপন্থিদের ভোটে জামায়াত জিতত। এই ভোট বিএনপির দিকে এনেছিল জমিয়ত। কিন্তু এর মূল্যায়ন হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলছেন, বিএনপি ও সরকার তাদের ‘জোট নিয়ে ষড়যন্ত্র’ করছেন বলে মনে করেন তারা। তবে এতে ১১ দলীয় জোটের কোনো ক্ষতি হবে বলে তারা মনে করছেন না। তবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী জামায়াত-জোট নিয়ে ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক কৌশলে বিএনপি যদি অন্য রাজনৈতিক দলকে কাছে টানতে পারে, তাতে দোষের কিছু নেই।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুখপাত্র ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলছেন, তারা জামায়াত জোটে আছেন এবং সেই জোট ছাড়ার কোনো চিন্তা এখনো তারা করেননি।