ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক : যানজট নয়, সময় ও অর্থনীতির অপচয় বন্ধের এখনই সময়
ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক (এন৩) কেবল একটি সাধারণ সড়ক নয়; এটি আমাদের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ধমনি। ঢাকা থেকে গাজীপুর, মাওনা, ভালুকা ও ত্রিশাল হয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রায় ১১২ কিলোমিটারের এই করিডরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানুষ ও পণ্য আনাগোনা করে। তবে দ্রুত বাড়তে থাকা যানবাহন, অপরিকল্পিত বাজার, স্থানীয় ও দূরপাল্লার গাড়ির অনিয়ন্ত্রিত মিশ্র চলাচল, অগুণতি সংযোগ সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সৃষ্ট কৃত্রিম জটলার (বটলনেক) কারণে এটি এখন জনভোগান্তি ও অর্থনীতির বড় ধরনের বোঝা হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—আমরা কি প্রতিবছর যানজটের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি চোখ বুজে সয়ে নেব, নাকি অবিলম্বে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে হাঁটব?
আরও পড়ুন: দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের সদর : আজকের সিদ্ধান্ত, আগামী দিনের ভবিষ্যত
প্রতিদিন কত মানুষের সময় হারায়?
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বানানী-জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সংযোগের এন৩ সড়কটির দৈর্ঘ্য ১১১.৬ কিলোমিটার। ঢাকা ও গাজীপুর সংলগ্ন বেশ কয়েকটি অংশে যান চলাচলের মাত্রা এতটাই বেশি যে, কোনো কোনো পরিমাপ কেন্দ্রে দিনে প্রায় দুই লাখ যানবাহন গণনায় আসে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমানের ভারত সফর ও বাংলাদেশের ভোটের নিরাপদ ভবিষ্যৎ
পুরো করিডরের সুনির্দিষ্ট সরকারি দৈনিক যাত্রী পরিসংখ্যান প্রকাশ না থাকলেও, ট্রাফিক প্রবাহ ও গড় ধারণক্ষমতার ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক অর্থনৈতিক মডেলে প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৬ লাখ ‘যাত্রী-যাত্রা’ বিবেচনা করা যায়। পরিকল্পনার সুবিধার্থে মধ্যবর্তী ৫ লাখ যাত্রী-যাত্রাকে কার্যকর হিসাব হিসেবে ধরা হলো। এখানে ‘যাত্রী-যাত্রা’ বলতে একমুখী যাতায়াত বোঝানো হয়েছে; অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যাওয়া ও আসার পথে দুটি যাত্রী-যাত্রা হিসেবে গণ্য হবেন।
কর্মঘণ্টার আর্থিক অপচয়
বর্তমান পরিস্থিতি বিচারে একজন যাত্রীর গড়ে ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় নষ্ট হলে, প্রতিদিন ৫ লাখ যাত্রী-যাত্রায় মোট সময়ের অপচয় দাঁড়ায় ৫ থেকে ৭.৫ লাখ মানব-ঘণ্টা। নষ্ট হওয়া এই সময়ের মাত্র ৬০–৭০ শতাংশ যদি কর্মজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক বা উৎপাদিকা শক্তির মানুষ হন, তবে দিনে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টার পরিমাণ ৩ থেকে ৫ লাখ।
প্রতি কর্মঘণ্টার অর্থনৈতিক মূল্য গড়ে ১৫০ টাকা ধরলেও প্রতিদিনের অপচয় ৪.৫ থেকে ৭.৫ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। এটি সরকারি কোনো আনুমানিক চিত্র নয়, বরং ট্রাফিক বিলম্বের ওপর তৈরি একটি প্রাথমিক অর্থনৈতিক হিসাব। তবুও তা সমস্যার গভীরতা নির্দেশ করার জন্য যথেষ্ট।
ক্ষতির ব্যাপ্তি শুধু সময়ের নয়
ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি ধীরগতিতে চলায় অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়ছে, গণপরিবহন ও ট্রাকের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, খুচরা যন্ত্রাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, জরুরি রোগী পরিবহনে বিলম্ব এবং কর্মস্থলে পৌঁছাতে দেড়ির সামাজিক মূল্য। এসব যুক্ত করলে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক হাজার কোটি টাকা।
শুধু ৬ লেনে কেন স্থায়ী সমাধান নয়?
বিদ্যমান সড়ক চার লেন থেকে ছয় লেনে উন্নীত করলেই সংকট মিটবে না। সড়ক মাস্টার প্ল্যানে চিহ্নিত রয়েছে যে, সড়কের পাশে গড়ে ওঠা হাট-বাজার এবং স্থানীয় কর্মকাণ্ডই এই জটলার মূল কারণ। বাজার, অটোরিকশা, ধীরগতির যান, ইউ-টার্ন ও দূরপাল্লার বাস একই লেনে একসঙ্গে চললে অতিরিক্ত ধারণক্ষমতাও কয়েক বছরে অর্থহীন হয়ে পড়বে। এজন্য প্রয়োজন একটি ‘নিয়ন্ত্রিত-প্রবেশাধিকার বিশিষ্ট উচ্চ-ক্ষমতার এক্সপ্রেসওয়ে করিডর’।
যেমন হওয়া উচিত ঢাকা–ময়মনসিংহ এক্সপ্রেসওয়ে
সরকারের বিবেচনায় যে সমন্বিত প্রকল্প থাকা আবশ্যক:
৬ লেনের মূল গাড়ি চলাচলের পথ (ক্যারেজওয়ে) ও পাশে পৃথক সার্ভিস রোড;
গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে গ্রেড-সেপারেটেড ইন্টারচেঞ্জ ও ঘনবসতি বা বাজারের জন্য বাইপাস;
পথচারী ওভারপাস, আলাদা বাস বে ও ইন্টারচেঞ্জ;
ইলেকট্রনিক টোল সংগ্রহ, বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা (আইটিএস) ও জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থাপনা;
আধুনিক নিষ্কাশন (ড্রেনেজ) ব্যবস্থা, সড়ক নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং ভারী পণ্যবাহী যান ব্যবস্থাপনা।
বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক হিসাব
১১১.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়নে ২৫,০০০ কোটি টাকাকে মধ্যম ভিত্তি ধরে একটি প্রাথমিক মডেল দাঁড় করানো যায়। এই মডেলে দেখা যায়, প্রথম বছরই যানজট হ্রাস, সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং যানবাহনের পরিচালন ব্যয় কমে যাওয়ার মাধ্যমে আনুমানিক ৩,৩০০ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক সুফল অর্জিত হবে। বাৎসরিক ৩ শতাংশ হারে সুফল বৃদ্ধি ধরে ২০ বছরে ছাড়হীন পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক সুবিধার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮৮,০০০ কোটি টাকা।
১২ শতাংশ ছাড়ের হার বিবেচনা করলে প্রকল্পটির ব্যয় উসুলের মেয়াদ বা ‘পেইব্যাক পিরিয়ড’ হবে প্রায় ৮ বছর। পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (ইআইআরআর) দাঁড়ায় প্রায় ১২.৭ শতাংশ, বেনিফিট-কস্ট রেশিও (বিসিআর) ১.০৫ এবং নিট বর্তমান মূল্য (এনপিভি) দাঁড়ায় প্রায় ১,৩০০ কোটি টাকা। তবে নির্মাণ ব্যয় যদি ২০,০০০ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তবে এই রিটার্ন আরও শক্তিশালী হবে; পক্ষান্তরে ব্যয় ৩০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
টোল আয়ের বাড়তি সুযোগ
একটি পূর্ণাঙ্গ এক্সপ্রেসওয়ে হলে ইলেকট্রনিক টোল চালু করা সম্ভব। দিনে এক লাখ টোল প্রদানকারী যান ও গড়ে ৩০০ টাকা কার্যকর টোল ধরলে দিনে প্রায় ৩ কোটি এবং বছরে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব। এটি আর্থিক সম্ভাব্যতা, যা মূল অর্থনৈতিক উপযোগ থেকে আলাদাভাবে দেখতে হবে।
সরকারের করণীয়: অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা
ঢাকা–ময়মনসিংহ সড়ককে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে বিবেচনা করে অবিলম্বে একটি স্বাধীন সমীক্ষা চালানো দরকার। সেই সমীক্ষায় যে বিষয়গুলো থাকা জরুরি:
১. ২৪ ঘণ্টার সার্বক্ষণিক যান গণনা ও প্রকারভেদকরণ (বাস, কার, সিএনজি, মোটরসাইকেল, ট্রাক ইত্যাদি);
২. যাত্রী উপস্থিতি ও যাতায়াতের উৎস-গন্তব্য (অরিজিন-ডেস্টিনেশন) সমীক্ষা;
৩. সর্বোচ্চ চাপের সময় (পিক-আওয়ার) গতি ও বিলম্ব নির্ধারণ;
৪. পণ্য পরিবহন এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বিশ্লেষণ;
৫. ভূমি অধিগ্রহণের চাহিদা ও ৬ লেন বনাম ৮ লেনের তুলনামূলক লাভ-ক্ষতি;
৬. এক্সপ্রেসওয়ে বনাম মানোন্নয়নকৃত হাইওয়ের ইআইআরআর তুলনা এবং টোল প্রদানে আগ্রহের সমীক্ষা;
৭. ৩০ বছরের ট্রাফিক পূর্বাভাস, জলবায়ু সহনশীলতা এবং অর্থায়নের মডেল (পিপিপি, সরকারি নাকি সংকর অর্থায়ন) তুলনা।
আজকের এই ধীরগতি ও অবহেলা আগামী দিনে আরও অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে দেখা দেবে। প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অপচয় মেনে নেওয়া কোনো সুস্থ পরিকল্পনা হতে পারে না। সরকার যদি স্বচ্ছ উপাত্ত ও আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষার ভিত্তিতে অবিলম্বে একটি নিয়ন্ত্রিত ৬ লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা কেবল যানজট কমাবে না—উন্নয়ন ও জাতীয় উৎপাদনশীলতায় নতুন গতি আনবে। আজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে; এবং সে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক





