দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের সদর : আজকের সিদ্ধান্ত, আগামী দিনের ভবিষ্যত

Any Akter
মো. আজিজুল হক
প্রকাশিত: ১২:১৩ অপরাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৫:৫৪ অপরাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • বিবেচনায় আনতে হবে ভূপ্রকৃতি ও যোগাযোগের বাস্তবতা
  • মতভেদ থাকুক, সহিংসতা নয়

দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু উপজেলা সদর কোথায় হবে- এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ, আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। তাই সদর নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আবেগ, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সাময়িক চাপের ভিত্তিতে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা, ভূপ্রকৃতি, যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, পাগলায় উপজেলা সদর স্থাপনের দাবিতে যারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন, কর্মসূচি পালন করছেন এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও দাবি আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের আন্দোলন ও আন্তরিকতার প্রতি সম্মান থাকা উচিত। তারা নিজেদের বিশ্বাস ও এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই আন্দোলন করছেন। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশ ও দাবি-দাওয়ার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: তারেক রহমানের ভারত সফর ও বাংলাদেশের ভোটের নিরাপদ ভবিষ্যৎ

তবে আন্দোলনের নামে কোনো ধরনের সহিংসতা, পথচারী বা সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, মারধর কিংবা কুপিয়ে আহত করা, যানবাহনে হামলা, গাড়ি আটকে দেওয়া অথবা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারীদের ওপর আক্রমণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি প্রশাসনিক সদর কোথায় হবে- এমন একটি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। সেই ভিন্নতা গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত। কোনো পক্ষের মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করাকে অপরাধ হিসেবে দেখা কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হলে তা শুধু আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন করে না, বরং পুরো এলাকার সামাজিক সম্প্রীতিও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই দাবি আদায়ের আন্দোলন হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা থেকে সবাইকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

উপজেলা সদর নির্ধারণ এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ফলে বর্তমানের সুবিধা-অসুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রশাসনিক ও নগর কাঠামোর কথাও বিবেচনায় নিতে হবে।

আরও পড়ুন: রাজনীতি ছাড়া অর্থনীতি: উন্নয়নের অসম্পূর্ণ সমীকরণ

পাগলা ও নয়াবাড়ির ভূপ্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। পাগলা বাজারের আশপাশের অধিকাংশ এলাকা তুলনামূলকভাবে নিচু। বর্ষা মৌসুমে সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হওয়ার নজির রয়েছে; নিকট অতীতে অনেক স্থানে নৌকা ও ট্রলার চলাচলও ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ১৯৯৮ সালের বন্যার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষার পানি আগের মতো দীর্ঘস্থায়ী বা ব্যাপক আকারে দেখা না গেলেও এলাকার প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি যে নিচু, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে নয়াবাড়ি তুলনামূলকভাবে উঁচু এলাকা। বর্ষা মৌসুমেও সেখানে পানি জমে না বললেই চলে। এ কারণেই নিচু এলাকার অনেক কৃষক বর্ষার পানিতে নিজেদের বীজতলা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নয়াবাড়ি ও সংলগ্ন এলাকায় জমি ভাড়া নিয়ে আউশ ধানের বীজতলা প্রস্তুত করেন। কৃষকদের এই বাস্তব অভিজ্ঞতাও দুই এলাকার ভূপ্রকৃতিগত পার্থক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

ভবিষ্যৎ নগরায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উপজেলা সদরকে কেন্দ্র করে একসময় পৌরসভা গঠনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। পাগলা দত্তের বাজার ইউনিয়নের প্রায় মাঝামাঝি অবস্থিত। সেখানে পৌরসভা গঠিত হলে দত্তের বাজার ইউনিয়নের বড় একটি অংশ পৌর এলাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন অবশিষ্ট এলাকা একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

পক্ষান্তরে, তিন ইউনিয়নের প্রায় সংযোগস্থল নয়াবাড়িতে উপজেলা সদর স্থাপিত হলে সংলগ্ন তিনটি ইউনিয়নের অংশবিশেষ নিয়ে একটি পরিকল্পিত পৌরসভা গঠন করা সম্ভব হতে পারে। এতে ইউনিয়নগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোও তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণভাবে বজায় রাখা সহজ হবে।

যোগাযোগব্যবস্থার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অন্যতম শিল্পসমৃদ্ধ জেলা গাজীপুরের শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলার সন্নিকটে এই নতুন উপজেলার অবস্থান। পাগলা বাজার থেকে গাজীপুরের দূরত্ব তুলনামূলকভাবে কম হলেও নয়াবাড়ি থেকেও বহুমুখী যোগাযোগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দত্তের বাজার-টাঙ্গাব হয়ে কাপাসিয়ার টোক নয়ন বাজার দিয়ে গাজীপুরে প্রবেশ করা যায়। আবার পাগলা হয়ে দক্ষিণে ত্রিমোহনী-বর্মী বাজার এবং পশ্চিমে গয়েশপুর-কাওরাইদ হয়ে গাজীপুর ও রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া নয়াবাড়িকে কেন্দ্র করে উত্তরে গফরগাঁও, পূর্বে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর ও পাকুন্দিয়া, উত্তর-পশ্চিমে মশাখালী হয়ে ভালুকা এবং দক্ষিণে কাওরাইদ হয়ে শ্রীপুর ও গাজীপুরের সঙ্গে বহুমুখী সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। অর্থাৎ যোগাযোগের দিক থেকে নয়াবাড়ি কোনো বিচ্ছিন্ন এলাকা নয়; বরং ভবিষ্যতে এটি একটি আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।

নয়াবাড়ির উঁচু ভূমি, পাশেই বৃহৎ ও প্রাচীন কান্দিপাড়া বাজার এবং অল্প দূরত্বের মধ্যে পাগলা ও দত্তের বাজারের মতো ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর অবস্থান ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। সেখানে এমন একটি উপজেলা শহর গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে এলাকার গ্রামীণ চরিত্র সংরক্ষিত থাকবে এবং একই সঙ্গে আধুনিক নাগরিক সুবিধারও বিকাশ ঘটবে।

তবে সদর নির্ধারণে শুধু পাগলা বা নয়াবাড়ি- এই দুই বিকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিলেই হবে না। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ভূপ্রকৃতি, বন্যা-ঝুঁকি, যোগাযোগ, জনসংখ্যা, ভূমির প্রাপ্যতা, কৃষি, ভবিষ্যৎ নগরায়ন এবং প্রশাসনিক সুবিধা নিয়ে একটি সমন্বিত সমীক্ষা করা যেতে পারে। সেই সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ্য করে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মতামতও নেওয়া যেতে পারে। এতে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে বিরোধের সুযোগ কমবে।

এই আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো এলাকার দাবি খাটো করা নয়; বরং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে একটি বাস্তবসম্মত, টেকসই ও সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। উপজেলা সদর কোনো এক দিনের জন্য নির্ধারিত হয় না; এটি আগামী প্রজন্মের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাই সিদ্ধান্ত হতে হবে তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দক্ষিণ গফরগাঁওবাসীর উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বিজয় কিংবা পরাজয়ের ওপর নির্ভর করে না। সদর যেখানেই হোক, পুরো উপজেলার সব ইউনিয়নের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম শর্ত হলো- ভিন্নমতের প্রতি সম্মান, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার এবং সহিংসতা ও জনদুর্ভোগের সম্পূর্ণ পরিহার।

সুতরাং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলার সদর নির্ধারণে আবেগ নয়, প্রয়োজন দূরদর্শিতা; রাজনৈতিক চাপ নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন; বিরোধ নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা। আজকের সিদ্ধান্ত যেন আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন সমস্যা সৃষ্টি না করে- সেই দায়িত্ববোধ থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।