তারেক জিয়ার ভারত সফর এই মুহূর্তে নিরাপদ নয়
তারেক রহমানের ভারত সফর ও বাংলাদেশের ভোটের নিরাপদ ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক ও স্পর্শকাতর রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী দিনের নির্বাচন, জনমতের প্রতিফলন এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নির্ভর করছে এই দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি কতটা মজবুত হবে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ভারত সফর ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়াস ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের মনে আজ একটিই মৌলিক প্রশ্ন—বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট এবং বিএনপির কৌশলগত পরিবর্তনের মুখে দেশের ভোট ও ভোটাধিকার কি সত্যিই নিরাপদ?
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সম্পর্কের নতুন রসায়ন
আরও পড়ুন: দক্ষিণ গফরগাঁওয়ের সদর : আজকের সিদ্ধান্ত, আগামী দিনের ভবিষ্যত
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক প্রভাব ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুস্তরিক। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি এবং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কিছু দূরত্ব পরিলক্ষিত হলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেখানে নতুন সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তারেক রহমানের ভারত সফর বা দিল্লির সাথে সম্পর্কের এই বরফ গলার প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষকরা দুইভাবে দেখছেন:
আরও পড়ুন: রাজনীতি ছাড়া অর্থনীতি: উন্নয়নের অসম্পূর্ণ সমীকরণ
কূটনৈতিক ভারসাম্য স্থাপন: একটি দেশের সার্বভৌম নীতি বজায় রেখে পার্শ্ববর্তী পরাশক্তির সাথে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন করা যেকোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের জন্য স্বাভাবিক কৌশল।
আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা: বিগত বছরগুলোর দূরত্ব কাটিয়ে দিল্লির নীতিপ্রণেতাদের সাথে সরাসরি সংলাপে যুক্ত হয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা।
তবে এই সফর ও কূটনৈতিক সমীকরণের মাঝে দেশের অভ্যন্তরীণ ভোটাধিকারের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
'ভোটাধিকার' এবং সাধারণ মানুষের শঙ্কা
বাংলাদেশের মানুষের কাছে 'নিরাপদ ভোট' কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি তাদের নাগরিক মর্যাদার প্রতীক। অতীতে নানা সময় আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার টানাপোড়েনে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত হয়েছে। ফলে, কোনো বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতার বিদেশ সফর বা বাইরের শক্তির সাথে ঘনিষ্ঠতাকে এ দেশের রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনগণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়:
বাইরের কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে কি বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হবে?
বিদেশি পরাশক্তির সমর্থন আদায়ের লড়াইয়ে জনগণের প্রকৃত রায় আবার দ্বিতীয় সারিতে চলে যাবে না তো?
যদি রাজপথের আন্দোলন বা রাজনৈতিক শক্তি বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে কি জনগণের ভোটের ওপর তাদের জবাবদিহিতা হ্রাস পাবে?
কূটনৈতিক সমীকরণ ও অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব
একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচনের চাবিকাঠি থাকা উচিত কেবল এবং কেবলই সে দেশের জনগণের হাতে। বৈদেশিক সম্পর্কের গুরুত্ব অনস্বীকার্য—ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক জরুরি। কিন্তু সেই কূটনৈতিক সখ্য বা সমীকরণ যদি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নির্বাচনের দিকনির্দেশক হয়ে ওঠে, তবে তা গণতন্ত্রের মূল সুরকে ব্যাহত করে।
তারেক রহমানের এই সফরের আলোচনা জনগণের মনে এই বার্তাও দেয় যে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি অপেক্ষা বাইরের শক্তির সবুজ সংকেতকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়, তবে সাধারণ মানুষের "ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তনের" ক্ষমতার ওপর আঘাত আসতে পারে।
নিরাপদ ভোটাধিকারের স্বার্থে করণীয়
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং জনগণের ভোটাধিকারকে সর্বাত্মক সুরক্ষা দিতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া অপরিহার্য:
জনগণের ওপর আস্থা: যেকোনো রাজনৈতিক দলকে বুঝতে হবে যে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার আসল উৎস দেশের জনগণ। বিদেশি সমর্থন কেবল কূটনৈতিকভাবে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত জনম্যান্ডেট পেতে হবে ভোটের মাধ্যমেই।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: বৈদেশিক সফর বা বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও কৌশল দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যাতে কোনো ধরনের গোপন সমঝোতার সন্দেহ তৈরি না হয়।
শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থা: একটি অরাজনৈতিক, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা, যা যেকোনো বহিরাগত বা অভ্যন্তরীণ চাপ উপেক্ষা করে নিরপেক্ষ ভোট পরিচালনায় সক্ষম হবে।
সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ: দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে হবে পল্টন, গুলশান কিংবা রাজপথের জনমতের ভিত্তিতে—কোনো বিদেশি রাজধানীর কার্যালয়ে নয়।
উপসংহার
তারেক রহমানের ভারত সফর বা আন্তর্জাতিক মহলের সাথে বিএনপির সংযোগ কেবল কূটনৈতিক কৌশলের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু এই ধরনের সফরের রাজনৈতিক প্রভাব যেন দেশের সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি না করে। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে, ভারতের সাথে সমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখেও তারা বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকারের সুরক্ষায় শতভাগ আপসহীন।
ভোট তখনই নিরাপদ হবে, যখন একটি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রেসক্রিপশনে নয়, বরং দেশের কোটি কোটি নাগরিকের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
লেখক: মমিনুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, উলিপুর রিপোর্টার্স ইউনিটি





