কওমি মাদরাসার আদর্শিক সংকট ও উত্তরণের পথ

Shahrier Islam Pallab
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (পীর সাহেব দেওনা)
প্রকাশিত: ১২:৩৮ অপরাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:৩৮ অপরাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আল্লাহ তাআলা কোনো জাতিকে সম্মান, মর্যাদা ও প্রভাব দান করেন তাদের ঈমান, আমল, চরিত্র, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক এবং দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে। তারা যখন নিজেদের দায়িত্ব ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে সরে যায়, তখন ধীরে ধীরে তাদের মর্যাদার কারণগুলোও বিলুপ্ত হতে থাকে। তাই কওমি মাদরাসার বর্তমান সংকটের কারণ ও উত্তরণের পথ নির্ধারণ করতে হলে শুধু বাহ্যিক কারণ নয়, আমাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোর দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

কওমি মাদরাসার প্রকৃত পরিচয়

আরও পড়ুন: প্রাচীন পুরাণ থেকে আধুনিক মানুষের অন্তর্জগৎ: নোবেলজয়ী কবি অ্যান কারসনের সাহিত্যদর্শন

উপমহাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর সবচেয়ে মূল্যবান ঐতিহ্য হলো আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা-চেতনা, দ্বীনি মেজাজ, ইখলাস, তাকওয়া, সুন্নাহর অনুসরণ, আল্লাহমুখী জীবন এবং দ্বীনের খেদমতের মানসিকতা। কওমি মাদরাসার বৈশিষ্ট্য শুধু এর সিলেবাস বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো ইলমের গভীরতা, আমলের সৌন্দর্য, আল্লাহভীতি ও ইখলাসের সমন্বয়ে দ্বীনের জন্য ত্যাগী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা।

সনদ নয়, মূল লক্ষ্য যোগ্য ও মুত্তাকি আলেম তৈরি করা

আরও পড়ুন: নারীর ক্ষমতায়ন: কাচের ছাদ ভেঙে সম্ভাবনার দিগন্তে

কওমি মাদরাসার মূল লক্ষ্য সনদের স্বীকৃতি আদায় কিংবা সার্টিফিকেট অর্জন নয়। বরং এর লক্ষ্য হলো এমন যোগ্য, মুত্তাকি ও দূরদর্শী আলেম তৈরি করা, যাঁরা কুরআন-সুন্নাহ গভীরভাবে অনুধাবন করে দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং সমাজের নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবেন। আকাবিরে দেওবন্দের অনেক আলেম শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর কোনো সনদ গ্রহণ করেননি। কারণ, তাঁদের লক্ষ্য সনদ অর্জন ছিল না; বরং নিজেদের যোগ্য ও মুত্তাকি আলেম হিসেবে গড়ে তোলা এবং দ্বীনের একজন প্রকৃত খাদেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য।

সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনাযোগ্য

সনদের স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। কিন্তু স্বীকৃতির নামে যদি কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হয়, দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শ, মূলনীতি ও মতপথের পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কিংবা বিদ্যমান আইন লঙ্ঘিত হয়, তাহলে সেই স্বীকৃতি কওমি মাদরাসার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। কারণ, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ইলম, আমল, আখলাক ও যোগ্যতার সমন্বয়ে প্রকৃত মুত্তাকি আলেম তৈরি করা। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, আমরা ছিলাম একটি লাঞ্ছিত জাতি। আল্লাহ ইসলাম দ্বারা আমাদের সম্মানিত করেছেন। অতএব, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো পথে সম্মান খুঁজলে আল্লাহ আমাদের সম্মানের পরিবর্তে অপদস্থ করবেন। মনে রাখতে হবে, পদ-পদবি ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে আমাদের মধ্যে বিচ্যুতি দেখা দিলে কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা বিনষ্ট হওয়ার এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

স্বকীয়তা ও যুগসচেতনতা

এর অর্থ এই নয় যে, কওমি মাদরাসার আলেমরা যুগের পরিবর্তন ও সমকালীন সমস্যার ব্যাপারে অসচেতন থাকবেন। বরং কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী ফিকহের আলোকে যুগের নতুন সমস্যাগুলো অনুধাবন এবং সেগুলোর সমাধান দেওয়ার মতো যোগ্য আলেম তৈরি করাও জরুরি। যে ব্যক্তি নিজের যুগ ও সমকালীন মানুষের অবস্থা সম্পর্কে অবগত নন, তাঁর জ্ঞান অসম্পূর্ণ। এ কথাটি আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে। একইভাবে, শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কিংবা কর্মসংস্থানের উপযোগী করার নামে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়নের অজুহাতে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে দ্বীনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা, নিজস্ব সিলেবাস, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, ইখলাস, তাকওয়া, সুন্নাহর অনুসরণ, ইলমের গভীরতা এবং আকাবিরে দ্বীনের রেখে যাওয়া আমানত রক্ষা করা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের বৈষম্য

২০১৮ সালে আইন পাসের মাধ্যমে দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) সনদকে ইসলামী স্টাডিজ ও আরবি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কওমি আলেমদের সে অনুযায়ী মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই মানের কিংবা কখনো তুলনামূলক কম মানের সনদধারীরা যেখানে উচ্চতর গ্রেড ও পদোন্নতির সুযোগ পান, সেখানে কওমি আলেমদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে। এনটিআরসিএর নিবন্ধন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কওমি শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা রয়েছে। তাঁদের মূল শিক্ষার বিষয় কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আরবি, উর্দু, ফারসি, নাহু-সরফ ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ পরীক্ষায় তাঁদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রতিযোগিতা করতে হয়। ফলে একটি বিশেষায়িত দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সহশিক্ষা কিংবা এমন কর্মপরিবেশ, যেখানে পর্দা ও দ্বীনি আদর্শ অনুসরণ করা কঠিন, সেখানে কওমি আলেমদের চাকরির সুযোগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের ঈমান, আমল ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

কারি সনদ ও বাস্তব দক্ষতা

১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেফাকুল মাদারিসের একটি বিজ্ঞপ্তিতে দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) উত্তীর্ণদের কিরাত ও তাজবিদ বিষয়ে পরীক্ষার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু কিরাত এমন একটি ব্যবহারিক দক্ষতা, যা শুধু লিখিত পরীক্ষা কিংবা হিফজের সনদের ভিত্তিতে পুরোপুরিভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। মাখারিজ, সিফাত ও তিলাওয়াতের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে যোগ্য উস্তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত মশক অপরিহার্য। তাই কারি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি কায়দার মানদণ্ড অনুযায়ী তিলাওয়াত ও ব্যবহারিক দক্ষতা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

মূল কিতাবকেন্দ্রিক শিক্ষা ফিরিয়ে আনা

কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ছিল মূল কিতাবকে কেন্দ্র করে ইলম চর্চা করা। শুধু নোট বা অনুবাদনির্ভর পড়াশোনা নয়; বরং ইবারত পাঠ, নাহু-সরফের যথাযথ প্রয়োগ এবং মূল আরবি থেকে সরাসরি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা অর্জনই ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বর্তমানে নোটনির্ভরতা, অনুবাদনির্ভর পড়াশোনা ও গাইডবইয়ের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মূল কিতাবের সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। তাই মূল কিতাবকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের এমন আরবি দক্ষতা তৈরি করতে হবে, যাতে তাঁরা পাঠ্যবইসহ যেকোনো আরবি লেখা হরকত ছাড়া পড়তে, অনুবাদ করতে এবং ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন।

দাওরায়ে হাদিসের মেয়াদ দুই বছর করা

দাওরায়ে হাদিসের সময়সীমা এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। এত অল্প সময়ে সিহাহ সিত্তার বিশাল হাদিসভান্ডার যথাযথভাবে পড়ানো ও বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। বুখারি শরিফসহ গুরুত্বপূর্ণ কিতাবগুলো তাড়াহুড়ো করে শেষ করতে হয়। তাহাবি শরিফ, মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রহ.) ও মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতো কিতাবগুলোর জন্য আরও বেশি সময় বরাদ্দ করা প্রয়োজন। তাই দাওরায়ে হাদিসের শিক্ষাক্রমকে দুই বছরে বিভক্ত করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

ইসলামী শিক্ষায় দক্ষ ব্যক্তি তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য

কওমি মাদরাসার মূল উদ্দেশ্য বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, প্রকৌশলী কিংবা চিকিৎসক তৈরি করা নয়; বরং কুরআন-সুন্নাহ, তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও সংশ্লিষ্ট ইসলামী জ্ঞানে দক্ষ আলেম তৈরি করা। এর পাশাপাশি যুগসচেতনতা, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবিলা করার মতো দূরদর্শিতা সম্পন্ন আলেম তৈরি করাও প্রয়োজন। তবে একজন ব্যক্তিকে একই সঙ্গে উচ্চমানের আলেম, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী বানানোর অবাস্তব প্রত্যাশায় মূল দ্বীনি শিক্ষার গভীরতা নষ্ট করা উচিত নয়।

আমাদের সুপারিশসমূহ

কওমি মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত উন্নয়ন, আদর্শিক স্বকীয়তা সংরক্ষণ এবং যুগোপযোগী আলেম তৈরির লক্ষ্যে আমাদের সুপারিশগুলো হলো—

১. তাসাউফ ও আখলাকবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা।

২. ফিরাকে বাতেলা-সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় কিতাব নেসাবভুক্ত করা।

৩. শিক্ষার্থীদের সুন্দর হাতের লেখা ও লেখার দক্ষতা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ করা।

৪. কওমি শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা।

৫. মাদরাসার বাইরের মুসলিম সন্তানদের পবিত্র কুরআন ও প্রয়োজনীয় দ্বীনি শিক্ষা প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৬. ইসলামী সিয়াসতকে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। অধ্যয়নকালীন সময়ে এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত অবস্থায় এর চর্চা থেকে বিরত থাকা।

৭. দারুল উলূম দেওবন্দের মূলনীতি ও আদর্শ সুরক্ষা করা এবং ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ৪৮ নম্বর আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।


লেখক: অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (পীর সাহেব দেওনা)

সভাপতি, কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ

নায়েবে আমির, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ