বদলির পর দুই জেলার এসপিকে যোগদানে মানা

এসপি ওসি নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম ও বাণিজ্য

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:২০ অপরাহ্ন, ০৭ মে ২০২৬ | আপডেট: ৮:২৫ অপরাহ্ন, ০৭ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • পছন্দের পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগে মন্ত্রী এমপি ও শীর্ষ নেতাদের দৌড়ঝাঁপ

দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি ও জেলার এসপি নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। মাঠ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ এই পদগুলোতে কর্মকর্তা বাছাইয়ে মানা হচ্ছে না কোনো বিধি-বিধান ও দীর্ঘদিনের প্রথা। পদায়নে তদবিরকেই মুখ্য যোগ্যতা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ অনেকের।

নতুন সরকার গঠনের পর সারাদেশে জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ওসি নিয়োগের বিষয়টি সামনে চলে আসে। বড় বড় জেলার পুলিশ সুপার ও রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি নিয়োগে পুলিশ কর্মকর্তারা মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ নেতাদের দুয়ারে দৌড়ঝাঁপ করছে। মন্ত্রী-এমপিরাও নিজ নিজ এলাকায় পছন্দের ব্যক্তিদের ওসি-এসপি নিয়োগে তদবিরে নেমে পড়েছে। অভিযোগ আছে, পছন্দের ব্যক্তিকে নিজের এলাকায় নিতে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথার্থতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। থানার ওসি নিয়োগে আর্থিক লেনদেন ও তদবিরের খবরে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক দুই দফায় পত্রিকায় সতর্কবার্তা প্রেরণ করেছেন।

আরও পড়ুন: বিজিবির অভিযানে এপ্রিল মাসে ১৮৩ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ

এদিকে গত মঙ্গলবার জেলার এসপি নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রদল নেতা, সহ দুটি হত্যা ও গুমের আসামিসহ নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সাবেক নেতাদের পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠার পর ফেনী ও ঝালকাঠি জেলার পুলিশ সুপারকে যোগদান করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নিষেধ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে তাদের বদলি করা হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এসপি ও ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে যাচাই-বাছাই করে সৎ ও দক্ষ, পেশাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগের গুরুত্ব দিয়েছেন সাবেক আইজিপি ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন: জুনে মাঠ থেকে ব্যারাকে ফিরতে পারে সেনাবাহিনী

পুলিশের সাবেক আইজিপি ও অপরাধ বিশ্লেষক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকার তাদের চাহিদা মোতাবেক অবশ্যই পুলিশ প্রশাসনকে জনস্বার্থে ঢেলে সাজাবে। তবে সেক্ষেত্রে সঠিক লোক যাতে সঠিক স্থানে নিয়োগ পায় এজন্য যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত। বিগত সরকারের সময় যারা অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না। দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুসরণ করে কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে সৎ, দক্ষ ও সক্ষমতা সম্পন্ন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া উচিত।

মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের আলোচিত উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলমকে চট্টগ্রাম জেলার এসপি হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

আরেক আদেশে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার, বরিশাল মহানগর পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার এবং সিলেট রেঞ্জের ডিআইজিকে বদলি করা হয়েছে।

একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, ফেনী, পঞ্চগড়, বান্দরবান, জয়পুরহাট, পাবনা, নীলফামারী, নড়াইল, সাতক্ষীরা, চাঁদপুর, ঝালকাঠি ও মৌলভীবাজারের এসপিকে পরিবর্তন করে নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে চট্টগ্রামের এসপি মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খানকে এপিবিএনে পাঠিয়ে ডিএমপির ডিসি মো. মাসুদ আলমকে চট্টগ্রামের এসপি, ফেনীর এসপি মো. শফিকুল ইসলামকে পুলিশ অধিদপ্তরে পাঠিয়ে ফেনীর এসপি করা হয়েছে সিএমপির ডিসি মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে।

এছাড়া উপসচিব পদ থেকে প্রত্যাগত শাহেদুল আকবর খানকে এসবিতে এসপি হিসেবে, ১৩ এপিবিএনের এসপি এলিজা শারমীনকে পুলিশ অধিদপ্তরে, ডিএমপির ডিসি মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান ও এপিবিএনের কাজী আখতার উল আলমকে এসবিতে, ডিএমপির ডিসি মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম ও ডিএমপির ডিসি মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়াকে খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) ডিসি হিসেবে এবং এপিবিএনের এসপি সাজেদুর রহমানকে ডিএমপিতে বদলি করা হয়েছে।

অপর এক আদেশে পঞ্চগড়ের এসপি মো. রবিউল ইসলামকে নৌ পুলিশে পাঠিয়ে এপিবিএনের মো. মিজানুর রহমানকে পঞ্চগড়ের এসপি করা হয়েছে।

বান্দরবানের এসপি মো. আবদুর রহমানকে রংপুর মহানগর পুলিশের ডিসি, এসবির মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকারকে বান্দরবানের এসপি, জয়পুরহাটের এসপি মিনা মাহমুদাকে ডিএমপিতে, ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের এসপি শাহনাজ বেগমকে জয়পুরহাটের এসপি করা হয়েছে।

পাবনার এসপি মো. আনোয়ার জাহিদকে এসবিতে, এসবির মো. ছুফি উল্লাহকে পাবনার এসপি, নীলফামারীর এসপি শেখ জাহিদুল ইসলামকে ডিএমপিতে, শিল্পাঞ্চল পুলিশের মো. ফরহাদ হোসেন খানকে নীলফামারীর এসপি, নড়াইলের এসপি মোহাম্মদ আল মামুন শিকদারকে ট্যুরিস্ট পুলিশে, ডিএমপির ডিসি মল্লিক আহসান উদ্দিন সামীকে নড়াইলের এসপি, সাতক্ষীরার এসপি মো. আরেফিন জুয়েলকে এপিবিএনে, সারদার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলমকে সাতক্ষীরার এসপি করা হয়েছে।

এছাড়া চাঁদপুরের এসপি মো. রবিউল হাসানকে ডিএমপিতে, ঝালকাঠির এসপি মো. মিজানুর রহমানকে চাঁদপুরের এসপি, সিআইডির প্রত্যুষ কুমার মজুমদারকে ঝালকাঠির এসপি, মৌলভীবাজারের এসপি মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেনকে নৌ পুলিশে, আরএমপির ডিসি মো. রিয়াজুল ইসলামকে মৌলভীবাজারের এসপি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বর্ডারে গুম-খুনসহ একাধিক মামলার আসামি মাহবুব আলমকে ফেনীতে এসপি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।

যেখানে ফেনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে সরাসরি জড়িত ছিলেন মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান; তাকে জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।

চাপাইনবাবগঞ্জের সাবেক ছাত্রদল নেতার ২ ভাইকে গুম, অর্থ আদায়, পরবর্তীতে আর ফেরত না দেওয়ার অন্যতম হোতা হিসেবে মাহবুব আলমকে আসামি করে মামলা চলমান রয়েছে। উক্ত মামলার বাদী প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছে এই মাহবুবের নামে। অভিযোগে বলা হয়, বিএনপির কর্মীদের বাড়িতে ঘুমাতে না দেওয়ার জন্য পরিচিত এই এসপিকে বিএনপির সরকার ভালো জায়গায় নিয়োগ দিয়েছে।

মাহবুব আলম খান ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন। সেসময় সরাসরি ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেন। সেই মাহাবুব আলম হাসিনার পতনের পর ভোল পাল্টে ফেলেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা হয়। এর মধ্যে একটিতে কৌশলে নিজের নাম বাদ দিয়েছেন। কিন্তু বাকি দুটিতে এজাহারনামীয় আসামি এই মাহবুব আলম। কিন্তু জেলার এসপি হিসেবে তাকে পদায়ন করা হলো— কারা তাঁর আমলনামা দেখল? কারা তাকে পুনর্বাসিত করছে?

জানা গেছে, মাহবুব আলমের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনায়। ২৭তম বিসিএসে মাহবুব আলম পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। বিগত সরকারের আমলে প্রায় পাঁচ বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাকরি করেছেন। তৎকালীন সরকারকে খুশি করে বাগিয়ে নিয়েছেন ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক— পিপিএম’। তৎকালীন বিরোধী দল (বিএনপি-জামায়াতকে) দমনে ব্যাপক সক্রিয় ছিলেন এই মাহবুব। বিএনপির কাউকে ঘরে ঘুমাতে দিতেন না।

এদিকে মাহবুবকে যেন জেলায় পদায়ন করা না হয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত নতুন প্রদান হওয়া পুলিশ সুপার মাহবুবের আমলনামায় বলা হয়—

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার মামলা নং ২৫, তাং ১৩/০৯/২০২৪, ধারা: ১৪৩/৪৪৮/৩৬৪/৩৮৫/৩৮৬/৩৮৭/৩২৬/৩০৭/৩০২/৩৪ দ:বি:

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানার মামলা নং ৫৪, তাং ২০/১০/২০২৪, ধারা: ১৪৩/১৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩০২/৩৪ দ:বি:

সিআর মামলা নং-৯০৪/২৪ (শিবঃ), ধারা-১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩২৪/৩০২/৩৪ পেনাল কোড-১৮৬০।

বদলী দায়রা জজ আদালত, পরবর্তী তারিখ-২৮/০১/২৫ খ্রিঃ। এসপি মাহবুবের ফেনীতে পদায়ন নিয়ে আলোচনার ঝড় ও আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ফেনীতে যোগদান করতে নিষেধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিসিএস ২৮ ব্যাচের পুলিশ সুপার ফরহাদ হোসেন খানকে নীলফামারী জেলার পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরেও তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহিদ হাসান রাসেলের একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে দেখা গেছে। তার ফেসবুক প্রোফাইলে কভার ফটোতে গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদনকে তুলে ধরেছে। কুষ্টিয়ায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকাকালীন বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ওপর শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে।

এসপি প্রত্যুষ কুমার মজুমদারকে ঝালকাঠি জেলায় নিয়োগ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার থাকাকালীন গুরুতর বিভিন্ন অভিযোগে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। পুলিশ সুপার নিয়োগে বিতর্কিতদের নাম চলে আসায় বিব্রত হয়েছেন কর্মকর্তারা। নতুন নিয়োগ পাওয়া ঝালকাঠির পুলিশ সুপার প্রত্যুষ মজুমদার ও পুলিশ সুপার মাহবুব আলমকে যোগদান করতে পুলিশ নিষেধ করা হয়েছে। কর্মরত পুলিশ সুপারগণ দুই জেলায় কার্যক্রম চালাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্য সকল পুলিশ সুপারগণ বৃহস্পতিবার দুপুরের আগেই নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। অভিযোগ ওঠার পরও ফরহাদ হোসেন খানের নীলফামারী জেলায় যোগদান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বদলির আদেশ পাওয়ার পর অভিযোগ উঠতে ফরহাদ হোসেন খান একদিন আগেই নীলফামারী জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দিতে চলে গেছেন। এমনকি দ্রুত জেলা পুলিশ সুপারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা নীলফামারীতে যোগদান করা পুলিশ সুপারকে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুম, খুন, অসাধারণ ঘুষ, দুর্নীতি সহ নানা অভিযোগ থাকার পরেও এই কর্মকর্তাদের নতুন নির্বাচিত সরকারের সময়ে কারা জেলার পুলিশ সুপারের মতো পদে নিয়োগ দিতে তথ্যগোপন করে সহায়তা করেছে, তাদের বিচার দাবি করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি প্রশাসন আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ জানান, আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। তাদেরকে যাচাই-বাছাই করে পদায়ন করা হয়েছে। তাদের সকলকেই যোগদান করতে বলা হয়েছে।