অনলাইন জুয়া চক্রের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার, ২০ সিম ও চেকবই জব্দ: সিআইডি

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:৪৬ অপরাহ্ন, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:০১ অপরাহ্ন, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনাকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে নয়টি মোবাইল ফোন, ২০টি সিম কার্ড এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়েছে।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিটের একটি বিশেষ দল গত ১১ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।

আরও পড়ুন: জুলাইয়ে ডিএমপির সেরা বিভাগ মিরপুর, শ্রেষ্ঠ থানা মিরপুর

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রায়পুরা পৌরসভার শ্রীরামপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম (৪৬), মনোহরদীর নোয়াদীয়া গ্রামের মো. সোহেল (৩৭), রসুলপুর এলাকার মো. শফিকুল ইসলাম (২৭), উত্তর নোয়াদীয়া এলাকার মো. রুবেল মোল্ল্যা (৩৩) এবং নরসিংদী সদরের নয়াদরাকান্দিয়া এলাকার আইয়ুব হোসেন রিপন (৪৮)।

সিআইডি জানায়, রায়পুরা থানার রেলগেট কলেজ মার্কেট এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে, মনোহরদীর নোয়াদীয়া গ্রামের মৌলভী বাড়ি এলাকা থেকে সোহেলকে, মনোহরদী থানার সামনে রাজু টাওয়ার এলাকা থেকে শফিকুল ইসলাম ও রুবেল মোল্ল্যাকে এবং নয়াদরাকান্দিয়া এলাকা থেকে আইয়ুব হোসেন রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরও পড়ুন: ১৫ আগস্ট কেন্দ্র করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পুলিশের

মামলার এজাহার সূত্রে সিআইডি জানায়, সাইবার মনিটরিং ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নামে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার আয়োজন করা হতো। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব কার্যক্রমের প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন চালানো হতো বলে সিআইডির দাবি।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এসব সাইটে জুয়ায় অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে টপ-আপ বা ডিপোজিট করতে হতো। অর্থ জমা দেওয়ার জন্য বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়, ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হতো। অর্থ জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি বা বট মানি যুক্ত করা হতো বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, অনলাইন বেটিং সাইটে অর্থ জমা ও উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হতো। সময়ের সঙ্গে এসব নম্বর ও হিসাব পরিবর্তন করা হতো বলেও জানা গেছে।

চক্রটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এজেন্ট নিয়োগ করে এমএফএস নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত। পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে সরবরাহ করা হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

সিআইডি বলছে, এসব হিসাব ও নম্বর ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেন করা হতো। বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ এজেন্টরা একত্র করে কমিশন রেখে অবশিষ্ট অর্থ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের পর দেশের বাইরে পাচার করত—প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় মামলা করেছে। ১৯ মে ২০২৬ তারিখে করা মামলাটির নম্বর ২৪। এতে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

সিআইডির দাবি, প্রাথমিক তদন্তে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট এবং এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে অনলাইন বেটিং কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চক্রটির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।

জব্দ করা মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, ব্যাংক হিসাব ও চেকবইসহ বিভিন্ন আলামতের ফরেনসিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ চলছে। এর মাধ্যমে অনলাইন বেটিং কার্যক্রমে তাদের সংশ্লিষ্টতা, আর্থিক লেনদেনের ধরন, চক্রের অন্য সদস্য এবং অর্থের সম্ভাব্য গতিপথ শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।

মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিট। চক্রটির সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং অবৈধভাবে লেনদেন করা অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

এ ছাড়া অনলাইন বেটিং সাইটের পরিচালনাকারী, এজেন্ট, অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত এমএফএস ও ব্যাংক হিসাবের মালিক এবং চক্রটির দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, অনলাইন জুয়া কার্যক্রম বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট চক্রগুলো বিভিন্ন কৌশলে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন না করা এবং অনলাইন জুয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।