ছাড়িয়ে যেতে পারে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন রেকর্ড

Sadek Ali
এম মনিরুল আলম
প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ন, ২৩ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৮:৫৬ অপরাহ্ন, ২৩ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থবছরের ১১ মাস ২১ দিনেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩৪ দশমিক ৮৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩ হাজার ৪৮৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অর্থবছর শেষ হতে এখনও ৯ দিন বাকি থাকায় মোট রেমিট্যান্স ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স ৩৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে প্রায় ১৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এটি হবে সর্বোচ্চ বার্ষিক রেমিট্যান্স অর্জনের নতুন রেকর্ড।

আরও পড়ুন: নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা আহমাদ আর নেই

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০ দশমিক ৩২৮ বিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে চাঙ্গা অর্থনীতি

আরও পড়ুন: আবারও বাড়ল সোনার দাম

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আমদানির দায় পরিশোধে রেমিট্যান্স বড় ভূমিকা পালন করে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি, ডলারের চাহিদা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে নজরদারি বৃদ্ধির ফলও এই প্রবৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে, মধ্যপ্রাচ্য এখনো শক্ত ঘাঁটি

দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন। আয়, কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বিস্তারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে আসে।

তবে শ্রমবাজারভিত্তিক রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কুয়েতে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়মিতভাবে দেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন।

এছাড়া যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ইতালি ও সিঙ্গাপুর থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত প্রবাসীদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমজীবী কর্মীরাও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সচল রাখতে বড় অবদান রাখছেন।

ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রেমিট্যান্স

গত কয়েক অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স আসে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার। পরের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১৬১ কোটি ডলারে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আরও বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৩৯১ কোটি ডলারে উন্নীত হয়।

এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রথমবারের মতো ৩ হাজার কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছে যায়। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই রেকর্ডও ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

করোনা সময়ের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাচ্ছে বর্তমান প্রবাহ

এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনা মহামারির সময় দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা সে সময়ের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল। করোনাকালে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও প্রবাসীরা পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছিলেন। ওই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কা সামাল দিতে সহায়তা করেছিল।

বর্তমান সময়ে সেই রেকর্ড অনেক দূরে পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। অর্থনীতিবিদদের মতে, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, নতুন গন্তব্যে জনশক্তি রপ্তানি, ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের আয়ের উন্নতির কারণে রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

সামনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে

তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির এই ধারা ধরে রাখতে বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানো, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে হুন্ডি ও অবৈধ লেনদেন নিয়ন্ত্রণ, প্রবাসীদের সেবা উন্নয়ন এবং বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রেমিট্যান্স প্রবাহের বিকল্প নেই। তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।

চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে যে চিত্র স্পষ্ট হয়েছে, তা হলো—বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রেমিট্যান্স নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। আর সেই রেকর্ডের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে চলেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি।

জাতীয় সংসদে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী

এদিকে, মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের চতুর্দশ বৈঠকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বিদায়ী অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৪.৭৩ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৫.৬ শতাংশ।

রেমিট্যান্স আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ থেকে এসেছে ৪.২৬ বিলিয়ন ডলার। এর ঠিক পরপরই তৃতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে এসেছে ৪.১৭ বিলিয়ন ডলার। এই শীর্ষ তিন দেশ সম্মিলিতভাবে ১৩.১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৩.৪ শতাংশ।

তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখান থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার। এর পরের অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ২.৮০ বিলিয়ন ডলার।

এদিকে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যেও রেমিট্যান্সের গতি বেশ ভালো ছিল। এর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ইতালি, যেখান থেকে এসেছে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে ফ্রান্স থেকে ৩৩৫.৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং গ্রিস থেকে ১৮৫.২১ মিলিয়ন ডলার এসেছে। এ ছাড়া জার্মানি থেকে ১৮০.৬২ মিলিয়ন ও পর্তুগাল থেকে এসেছে ১০২.৪৩ মিলিয়ন ডলার।

প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে অন্য দেশগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রেমিট্যান্স এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২২৭.০৪ মিলিয়ন ডলার, কানাডা থেকে ২২৩.৯৮ মিলিয়ন ডলার, অস্ট্রেলিয়া থেকে ১৭৭.০৯ মিলিয়ন ডলার এবং জর্ডান থেকে ১৬৮.১৭ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

এর পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৪০২.৯১ মিলিয়ন ডলার, মালদ্বীপ থেকে ১৪১.০৯ মিলিয়ন ডলার, মরিশাস থেকে ১৪৩.৭১ মিলিয়ন ডলার, জাপান থেকে ১০৫.৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং ব্রুনাই দারুসসালাম থেকে ৮৭.৩৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।