নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তি চাপে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অযুহাতে নতুন করে সবজি-চাল,ডাল ডিমসহ অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তবে পণ্য পরিবহন ব্যয় প্রতি কেজিতে পয়সার হিসাবে বাড়লেও খুচরা বাজারে দাম বাড়ছে টাকার অঙ্কে। এতে বাড়তি চাপে পড়েছেন নিন্ম-মধ্যবিত্ত আয়ের সাধারণ মানুষ।
ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এর মধ্যে একের পর এক নিত্যপণ্যের দর বাড়তে থাকায় কম আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নতুন করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে গরিব মানুষের টিকে থাকতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ থেকে উত্তরণে বাজারে সরকারের কড়া নজরদারি প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: চারটি ডিজিটাল ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদনের সিদ্ধান্ত
জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা পুরোপুরি বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারে বাড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন সবজির দাম। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, ঝিঙা, ধুন্দল ও করলাসহ কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কথা বললেও ক্রেতাদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক পণ্যের দাম প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বেশি বাড়ানো হচ্ছে। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরার আগেই নতুন করে বাড়ছে ভোক্তার চাপ। গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। নতুন দাম কার্যকর হয় ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। এর পর থেকেই বিভিন্ন পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা এবং আটা-ময়দার দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এবার কাঁচাবাজারেও এর প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে।
রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহ আগে ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া লম্বা বেগুন এখন বাজারভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজির পটোল ও ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে হয়েছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা। করলা আগে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও এখন মানভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ঝিঙা, ধুন্দলসহ আরও কয়েকটি সবজির দামও বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা নঈম আহমেদ বলেন, পরিবহন খরচ বেড়েছে। পাইকারি বাজারে সবজির দামও বেড়েছে। আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই খুচরা বাজারেও দাম বাড়ছে। রায়হান আলী নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, মাদারীপুর থেকে যাত্রাবাড়ীতে বেগুন আসে। তেলের দাম বাড়ার আগে মাঝারি ট্রাকের ভাড়া ছিল প্রায় ১৮ হাজার টাকা। এখন সেটা ২১ হাজার টাকা হয়েছে। এই বাড়তি খরচ তো পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ হবেই। তবে ক্রেতাদের প্রশ্ন, পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে যদি প্রতি কেজি পণ্যের দাম সামান্য বাড়ে, তাহলে একসঙ্গে ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর যৌক্তিকতা কতটা? শ্যামবাজারের কেনাকাটা করতে আসা চাকরিজীবী শামীম বলেন, তেলের দাম বেড়েছে, পরিবহন খরচ কিছুটা বাড়বে, সেটা বুঝি। কিন্তু একবারেই কোনো কোনো সবজির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাবে, এটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বাজারে নজরদারি না থাকায় যে যার মতো দাম বাড়াচ্ছে। আরেক ক্রেতা আবদুল হাই বলেন, আগে যে টাকা নিয়ে বাজারে আসতাম, এখন একই টাকায় অর্ধেক পণ্য নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ার কথা বলে যদি সবকিছুর দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। এদিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ি-নাখালপাড়া, মহাখালী, কলমিলতা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে। সপ্তাহখানেক আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা। সেই হিসাবে আটা-ময়দা কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। তবে খোলা আটা ও ময়দার দর কিছুটা কম। পণ্য দুটি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ ও ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে। পাঁচ-ছয় দিনের ব্যবধানে খোলা আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে পাঁচ টাকা করে। আটা-ময়দার দাম বাড়ার বিষয়ে মহাখালী কাঁচাবাজারের কে বি স্টোরের স্বত্বাধিকারী বিকাশ বণিক বলেন, এক-দেড় মাস আগে আটা-ময়দার দাম বেড়েছিল। এখন আরেক দফা বাড়ল। নতুন করে দুই কেজির যে প্যাকেটজাত আটা ও ময়দা দিয়েছে কোম্পানিগুলো, সেগুলোর খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে ১৪০ এবং ১৬০ টাকা। তিনি বলেন, আমাদের সামান্য লাভ হয়। তাই গায়ের দরে বিক্রি করি। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে চাল এনে মহাখালী কাঁচাবাজারে বিক্রি করে ইয়াসিন ট্রেডার্স। দোকানটির বিক্রয়কর্মী বলেন, কৃষি মার্কেট থেকে আগে ছোট পিকআপে দেড় হাজার টাকার মতো ভাড়া ছিল। এখন ২০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। বাড়তি এই ভাড়া চালের দামেই যুক্ত হবে। ফলে দাম কিছুটা হলেও বাড়াতে হবে। তাঁর মতে, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে মিলারদেরও চাল ভাঙানোর খরচ বাড়বে। কয়েক দিনের মধ্যে তারাও হয়তো দাম বাড়াতে পারে। ফলে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই চাল বিক্রেতা।
আরও পড়ুন: তেলের প্রভাবে জীবনযাত্রার পদে পদে হিসাব নিকাশ
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। দুই টাকা বাড়ানোর জায়গায় ১০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওই শ্রেণির লোকেরা সবসময়ই দাম বাড়ানোর জন্য কোনো না কোনো ইস্যু খোঁজে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কারখানা, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেটেই পড়বে। তবে কোন পণ্যের দাম পরিবহন ব্যয়ের কারণে কতটা বাড়ার কথা, সেটির সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না। সরবরাহব্যবস্থায় কোথাও অসঙ্গতি তৈরি হলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে বাজারে এরই মধ্যে নতুন চাপের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও চালের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও সবজির বাজারে বাড়ছে দাম। ফলে জ্বালানি তেলের বাড়তি ব্যয়ের প্রকৃত প্রভাব কতটা এবং এর সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।





