হাম-ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া আক্রান্তে বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যসেবা

Any Akter
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৩:০৮ পূর্বাহ্ন, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৩:০৮ পূর্বাহ্ন, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ এআই
ছবিঃ এআই
  • হাসপাতালগুলোর মেঝেতেও  ওয়ার্ডেও ঠাঁই নেই; স্বজনদের সঙ্গে করিডোরে অসুস্থ শিশুরা 
  • হাসপাতাল গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে রোগীর স্বজনরা। 
  • ডেঙ্গু ও হামের রোগী বেশি হাসপাতাল : ডা. মো. নুরুল ইসলাম, পরিচালক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
  • হাসপাতালগুলোতে শয্যা স্বল্পতার কারণে হামে সংক্রমণ হচ্ছে: কামরুন নাহার, সহযোগী অধ্যাপক, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ

দেশে হাম-ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে একাকার শিশু ওয়ার্ডগুলো। এ রোগে আক্রান্ত রোগী নবজাতক ওয়ার্ডেও ঠাঁই নেই। স্বজনদের সঙ্গে করিডোরে অসুস্থ অবস্থায় সময় কাটছে শিশুদের। তবে হাসপাতালগুলোতে ২৭০ জন রোগীর জন্য চিকিৎসক রয়েছে ২ জন এবং নার্স ৩ জন। ফলে চিকিৎসা সেবা দিতে হিমসীম খাচ্ছে ডাক্তাররা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম-ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অনেক শিশুর জটিলতা দেখা দিচ্ছে, যা তাদের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে। এতে বড়ধরনের হতাশা ও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প ব্যবস্থায় এগিয়ে আসার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বেশ কয়েকজন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতালের তৃতীয় তলার একটি ওয়ার্ডে ছয় মাস বয়সী শিশু রাফিকে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছে। শিশুটির মা কাশফিয়া বলেন, পাঁচ দিন আগে জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি নিয়ে ওকে হাসপাতালে ভর্তি করি। পরে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে পরীক্ষায় নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। একই ওয়ার্ডে চার মাস বয়সী আয়েশাও ভর্তি রয়েছে।

তার মা জাহানারা আক্তার বলেন, প্রথমে হাম শনাক্ত হলেও কয়েক দিনের মধ্যে কাশি ও শ্বাস নিতে কষ্ট শুরু হয়। পরে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসকরা আয়েশার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান। রাজধানীর মুগদা হাসপাতালের ৮ তলায় শিশু ওয়ার্ডের নবজাতক ওয়ার্ড-১। এই ওয়ার্ডের সামনে বসে আছেন কয়েকজন নারী-পুরুষ। এর মধ্যে এক নারীর কোলে ৮ মাস বয়সী একটি শিশু ছটফট করছে। গায়ে র‌্যাশ থাকায় মা-বাবার সন্দেহ শিশুটির হাম হয়েছে। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা ধরে তারা এখানেই বসে আছেন, সিট পাচ্ছেন না। শিশুটির নাম জাবের। বাবা মো. মাইনুদ্দীন একবার নার্সদের কক্ষে যান, আরেকবার ডাক্তারদের কক্ষে যান। আকুতি জানান একটি সিটের জন্য। কিন্তু প্রতিবারই বলা হচ্ছে, অপেক্ষা করুন। এদিকে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় কান্না থামছে না শিশু জাবেরের। তাকে অক্সিজেনও দেওয়া হয়নি। মায়ের কোলে টানা ছটফট করছে শিশুটি। জাবেরকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যেখানে বসে আছেন, সেখানেই বারবার আসা-যাওয়া করছেন একদিনের নবজাতক কোলে থাকা মায়েরা। ডেঙ্গু ও নানা রোগে আক্রান্ত বিভিন্ন বয়সের শিশুরাও মায়ের সঙ্গে সেখানে আসছে। তারা খুব সহজেই হাম-আক্রান্ত শিশু জাবেরের সংস্পর্শে চলে আসছে। ওয়ার্ডটির অন্য পাশে ইমার্জেন্সি অক্সিজেন বেডে স্যালাইন লাগিয়ে ৩ বছরের ইয়ামিনকে শুইয়ে রেখেছেন মা শারমিন আক্তার। ছেলে তার ডেঙ্গু-আক্রান্ত। চার ঘণ্টা ধরে এখানে বসে আছেন তিনি।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা প্রস্তাব

কেন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে যাননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে সিট নেই। নিচেও যে কিছু বিছিয়ে রাখবেন, সে সুযোগও নেই। ছেলে অনেক অসুস্থ, তাকে স্যালাইন দিতেই হচ্ছে। তাই চিকিৎসক এখানে রেখে স্যালাইন দিয়েছেন।ইয়ামিনের ঠিক দেড়-দুই ফুট দূরত্বে ৫ দিনের নবজাতক কোলে নিয়ে বসে আছেন দাদি পারভীন বেগম। দুই ঘণ্টা ধরে নবজাতকটির হাতে ক্যানোলা দিয়ে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না থাকায় বাইরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান পারভীন বেগম।

গতকাল বুধবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এ চিত্র দেখা যায়। তিন ধরনের রোগীকে প্রায় একই জায়গায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে হাম-আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ আছে এমন রোগীও রয়েছে। ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা ২৭০ রোগীর চিকিৎসা চলছে এই ব্যবস্থাপনার মধ্যেই। সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ে ভর্তি থাকা শিশুরা একই জায়গায় এসে নার্সদের সেবা নিচ্ছে; স্যালাইন, ইনজেকশন, ওষুধ নিচ্ছে। তাদের কারোরই কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। মুগদা হাসপাতালের ৬০ বেডের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ২৫০-৩০০ রোগী। বিকেলের শিফটে ২৭০ শিশুর চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন মাত্র ২ জন মেডিকেল অফিসার ও ৩ জন নার্স। হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের একই জায়গায় চিকিৎসা দেওয়ায় তৈরি হয়েছে সংক্রমণের বড় ঝুঁকি। শিশু ওয়ার্ডে বিকেলের শিফটে ২৭০ রোগীর চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন মাত্র দুইজন মেডিকেল অফিসার ও তিনজন নার্স। জানতে চাইলে ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা মেডিকেল অফিসার ডা. নুশরাত জাহান বলেন, এই মুহূর্তে আমরা দুইজন এ ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছি। ওয়ার্ডে হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি আছে। এটি ৬০ বেডের ওয়ার্ড, কিন্তু সবসময় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো রোগী ভর্তি থাকে। হাসপাতালে হামের আলাদা ওয়ার্ড আছে, কিন্তু এখন কোনো সিট খালি নেই। তাই অনেক রোগী এখানে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডেরও একই অবস্থা। নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়াও রোগীরা জায়গা নিয়ে অন্যত্র অবস্থান নিয়েছে। আমরা হামে আক্রান্ত রোগীদের অভিভাবকদের সবসময় বলি, আপনারা আপনাদের বাচ্চাদের নিয়ে অন্য রোগীদের সংস্পর্শে আসবেন না। কিন্তু তারা তা শোনেন না। ফলে খুব সহজেই এখান থেকে রোগ ছড়াতে পারে। কুমিল্লার হোমনা উপজেলা থেকে ৩ বছরের বাইজিদকে নিয়ে গত রোববার রাতে মুগদা মেডিকেলে আসেন বাবা জিলানি। আসার পর একদিন পার হয়ে গেলেও এখনো সিট পাননি ডেঙ্গু ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডের বাইরে এক কোনায় ফ্লোরে সাদা কাপড় বিছিয়ে কোনোমতে ছেলেকে শুইয়ে রেখেছেন। মাথার উপরে নেই ফ্যান। মা শিল্পী খানম হাতপাখা দিয়ে টানা বাতাস করে যাচ্ছেন। বাইজিদের বাবা জিলানি বলেন, ১০ দিন ধরে ছেলের ছেড়ে ছেড়ে জ্বর আসে। ফার্মেসি থেকে বলে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন না থাকায় রোববার সকালে কুমিল্লার হোমনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই।

তারা জানায়, ওর ডেঙ্গু হয়েছে। সেখানে ওকে রাখতে পারবে না। ঢাকায় নিয়ে আসতে বলে। আর তাদের ওখানে যদি ভর্তি করাতে হয়, তাহলে বন্ড সই করে রাখতে হবে। তারা এমনভাবে আমাদের ভয় দেখিয়েছে যে, ওইদিন রাতেই ঢাকায় নিয়ে আসি। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে উদ্বিগ্ন অবস্থায় বসে আছেন শিশু আইরিনের বাবা মাসুদ আহমেদ। তিনি জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর ৪ দিন তাদের মেয়েকে ফ্লোরেই থাকতে হয়েছে। আজ তারা সিট পেয়েছেন। ইতোমধ্যে আইরিনের পুরো শরীর লাল র‌্যাশে ভরে গেছে। প্লাটিলেটও কমে গেছে।

মাসুদ আহমেদ বলেন, ৪ দিন মেয়েকে নিয়ে ফ্লোরেই ছিলাম, আজ সকালে সিট পেয়েছি। ওয়ার্ডে প্রচণ্ড গরম থাকায় মেয়ের অস্থিরতা বেড়ে গেছে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি, দেখি শেষ পর্যন্ত কী হয়। ওয়ার্ডে এত রোগীর চাপ, চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তাররাও। কথা হয় ডা. নুশরাত এর সঙ্গে। তিনি জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেক রোগী ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, যা মোটেও প্রয়োজন ছিল না। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা কোনো চিকিৎসা নেই। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সরকার থেকে যে গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে, সেটি মেনেই তারা চিকিৎসা দিচ্ছেন। অভিভাবকদের মশারি টানানোর কথা বললেও ওয়ার্ডে গরম থাকায় তারা টানান না। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীরা স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটি না করে ঢাকায় চলে আসেন। ফলে আমাদের ওপর অনেক বেশি চাপ পড়ে যায়।

তবে আইইডিসিআর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, রোগী এবং চিকিৎসকদের মাঝে যে একটি বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখানে স্পষ্ট। রোগীরা উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চাইলেও সেখানকার চিকিৎসকেরা ঝুঁকি নিচ্ছেন না। এর পেছনে অন্যতম কারণ, কোনো রোগী মারা গেলে চিকিৎসকরা মারধরের শিকার হন। তাই তারা ঝুঁকি না নিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। তিনি বলেন, হামের অন্যতম হটস্পট হলো হাসপাতালগুলো। ডেঙ্গু রোগীরা যদি হামে আক্রান্ত হন, তাহলে এর পরিণতি আরও ভয়ংকর হবে। হাসপাতালগুলোতে যদি সরকার পর্যাপ্ত আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে এর চরম মূল্য দিতে হবে। অবিলম্বে উপজেলা হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে। আর হাম রোগীদের সবার থেকে আলাদা করতে হবে।