ভাষার মাসে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

বাংলায় চিকিৎসা জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছে চিকিৎসা ফাউন্ডেশন

Sanchoy Biswas
মবিনুল ইসলাম রাশা, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ৪:২৮ অপরাহ্ন, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণ করি, শ্রদ্ধায় নত হই, উচ্চারণ করি মাতৃভাষার মর্যাদার কথা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যে ভাষার জন্য এত ত্যাগ, সেই ভাষা কি আমাদের জীবনের সবচেয়ে জরুরি ক্ষেত্র, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসায় যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? প্রেসক্রিপশনের অচেনা ইংরেজি শব্দ, রোগের জটিল পরিভাষা আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুর্বোধ্য ব্যাখ্যার ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষ অনেক সময় নিজের শরীর নিয়েই অন্ধকারে থেকে যায়। এই বাস্তবতার ভেতর ভাষার মাসে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে সামনে এসেছে চিকিৎসা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ—বাংলা ভাষায় সহজ স্বাস্থ্যশিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে।

তাদের বিশ্বাস, ভাষা আন্দোলনের চেতনা কেবল স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকলে তার পূর্ণতা আসে না; মানুষের জীবনরক্ষাকারী জ্ঞানও যদি মাতৃভাষায় না পৌঁছায়, তবে ভাষার অধিকার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই জায়গা থেকেই তারা বাংলা ভাষায় রোগ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ বিষয়ে প্রাঞ্জল ও সহজ প্রশিক্ষণ চালু করেছে। বিভিন্ন রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধের উপায় এবং প্রাথমিক চিকিৎসা—সবকিছু এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রাকৃতিক জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসভিত্তিক সুস্থতা, ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধনির্ভরতা কমানোর বিষয়ে। তাদের মতে, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করাই শেষ কথা নয়; রোগ যেন সৃষ্টি না হয়, সেটাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।

আরও পড়ুন: সাংবাদিক কন্যা উম্মে হাবিবার ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন

ডিজিটাল যুগের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ঘরে বসেই যুক্ত হচ্ছেন এই উদ্যোগে। তরুণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ—সহজ বাংলায় স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন অনেকে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী অফলাইন সেশন, সরাসরি কাউন্সেলিং ও স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষ এই প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সাড়া প্রমাণ করে বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যজ্ঞান পেলে মানুষ তা গ্রহণে আগ্রহী হয় এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে চায়।

সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিয়মিত বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করছে ফাউন্ডেশনটি। জাতীয় স্মৃতি সৌধ এলাকায় ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস ও ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের মতো বড় জনসমাগমে তারা জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সেনওয়ালিয়া এলাকায় তাদের প্রধান কার্যালয় এবং আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় রয়েছে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যেখানে নিউট্রিশনিস্ট, সাইকোলজিস্ট, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, গাইনি বিশেষজ্ঞ ও ফিজিওথেরাপি পরামর্শ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। একই ছাদের নিচে এতগুলো সেবা স্থানীয় মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: নতুন ক্লাবের আত্মপ্রকাশ, সভাপতি আফরা সম্পাদক আকাশ

প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে আছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. পবিত্র কুমার শীল, যিনি দক্ষিণ ভারতে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর দেশে ফিরে সাভার ও আশুলিয়ার মানুষের জন্য কাজ শুরু করেন। তিনি মনে করেন, চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে; কেউ কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করেন, কেউ বিদেশমুখী হন। তার ভাষায়, “মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা রিফিউজি হয়েছিলাম, আর আজ চিকিৎসা করাতে গিয়ে মানুষ এক ধরনের স্বাস্থ্য-রিফিউজি হয়ে যাচ্ছে। এই চক্র ভাঙতে হবে।” কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা ছাড়াই গত ছয় বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

বাংলা ভাষায় চিকিৎসা শিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন দেখতেন জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের অগ্রদূত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। মাতৃভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞানকে সহজ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, চিকিৎসা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উদ্যোগকে অনেকেই সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন। ভাষার মাসে তাই এই উদ্যোগ কেবল একটি স্বাস্থ্য প্রকল্প নয়; এটি ভাষা আন্দোলনের চেতনার সমকালীন প্রয়োগ। বাংলা যে শুধু সাহিত্য বা সংস্কৃতির ভাষা নয়, বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শিক্ষারও কার্যকর মাধ্যম হতে পারে—এই বার্তাই তারা ছড়িয়ে দিতে চায়।

ফেব্রুয়ারির আবেগময় দিনগুলোতে যখন আমরা ভাষার মর্যাদার কথা বলি, তখন এই উদ্যোগ নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—মাতৃভাষায় জ্ঞান পৌঁছালে মানুষ শক্তিশালী হয়, সচেতন হয় এবং রোগ প্রতিরোধে সক্ষম হয়ে ওঠে। ভাষার প্রতি প্রকৃত সম্মান হয় তখনই, যখন সেই ভাষা মানুষের জীবন বাঁচানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।