সমুদ্র গবেষণায় নতুন যুগ: চবিতে দেশের প্রথম ওশান গ্রাউন্ড স্যাটেলাইট স্টেশনের উদ্বোধন

Sanchoy Biswas
মো. সাবিত বিন নাছিম, চবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:৪১ অপরাহ্ন, ০৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৭ পূর্বাহ্ন, ১০ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নবনির্মিত 'স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টার' (SODIC-CU) এর শুভ উদ্বোধন ৯ জুন অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ১০টায় ওশান সেন্টারের উদ্বোধনী ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে উদ্বোধনের পর ১০.৩০টায় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম, চবির উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ও উদ্বোধন অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মোঃ কামাল উদ্দিন, চীনা প্রতিনিধি সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির ডেপুটি ডিরেক্টর প্রফেসর ড. ফু বিন। 

আরও পড়ুন: পরিবেশ গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি: জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন ঢাবির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। এ সেন্টার দেশের 'ব্লু ইকোনমি' বা সুনীল অর্থনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে প্রত্যাশা করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য সমুদ্রবিজ্ঞান বা সমুদ্র নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সমুদ্র সম্পদের একটি বিশাল অংশ এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে, কারণ আমরা জানি না এ সম্পদের সঠিক অবস্থান কোথায় বা এর সর্বোচ্চ ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব। এই বিশেষায়িত ডাটা এক্সট্রাক্টিং বা তথ্য আহরণ কেন্দ্রটি সেই শূন্যতা পূরণ করবে। এখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য আমরা আমাদের মৎস্য শিল্প, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং সমুদ্র পর্যবেক্ষণের কাজে লাগাতে পারব। 

তিনি বলেন, এ কেন্দ্রটি মূলত তথ্য সংগ্রহ করবে এবং তা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মাঝে পৌঁছে দেবে। এতে আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঠিক পূর্বাভাস দেওয়ার মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। কাকতালীয়ভাবে এই কেন্দ্রটি আমার নির্বাচনী এলাকার আওতাভুক্ত হওয়ায় আমি অত্যন্ত গর্বিত। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত হবে। 

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হানিফ

প্রতিমন্ত্রী এ উদ্যোগকে সফল করায় চীনা দূতাবাস কর্তৃপক্ষ, সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির সংশ্লিষ্ট ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি চবি উপাচার্য ও তাঁর দল এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যারা এই স্যাটেলাইট সেন্টারটি স্থাপনে কাজ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, সমুদ্রবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত এ ডাটা ইনোভেশন সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমুদ্র, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য উৎপাদন সম্ভব হবে, যা নীতিনির্ধারণ, আগাম সতর্কবার্তা প্রদান এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে। তবে এই কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রযুক্তি নয়, বরং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে তিনি কেন্দ্রটির সফলতা কামনা করে গবেষণা ও উদ্ভাবনে ইউজিসির সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আজকের এ আয়োজন কেবল একটি অবকাঠামোর উদ্বোধন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং কৌশলগত অবস্থানের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক। এটি একদিকে যেমন শিক্ষা ও গবেষণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, অন্যদিকে দেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। তিনি এ নতুন যাত্রার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন। 

সভাপতির বক্তব্যে চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। এ গ্রাউন্ড স্টেশনের সংগৃহীত তথ্য বা ডাটা ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারব। এর ফলে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ তৈরি হলো। চীনা সরকারের এই অনন্য আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার জন্য আমি তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আশা করি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে আমাদের এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। আজকের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমি প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। অনুষ্ঠানে চীনা প্রতিনিধি ও সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির ডেপুটি ডিরেক্টর প্রফেসর ড. ফু বিন বক্তব্য রাখেন। তিনি চট্টগ্রাম কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। উভয় দেশের মধ্যে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আশা ব্যক্ত করেন। এছাড়া সেন্টারটির প্রজেক্ট ডিরেক্টর প্রফেসর ড. মাও ঝিনহুয়া টেকনিক্যাল প্রেজেন্টেশন প্রদান করেন। এতে তিনি সেন্টার সম্পর্কে নানা বিষয় তুলে ধরেন। বক্তব্যে সেন্টারটির পরিচালক ও উদ্বোধন অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন সেন্টার সম্পর্কে যাবতীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।