ব্রাহ্মণপাড়ায় পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষিরা

Sadek Ali
মো. মাসুদ রানা, কুমিল্লা
প্রকাশিত: ১২:২৬ অপরাহ্ন, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৩:১৪ অপরাহ্ন, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা একসময় পান চাষের জন্য বেশ পরিচিত ছিল। চান্দলা, উত্তর চান্দলা, মাধবপুর ও মকিমপুর এলাকায় শত শত পরিবার পারিবারিকভাবে পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, রোগবালাই, বাজার সংকট ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় দিন দিন এ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চাষিরা।

চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক আগে চান্দলা ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ২৫০টি পান বরজ ছিল। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০–৩৫টিতে।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনে দুর্ঘটনায় ২ সেনা নিহত, আহত ১

উত্তর চান্দলা এলাকার পানচাষি আরুতী রানী পাল (৭০) জানান, প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি পারিবারিকভাবে পান চাষ করছেন। স্বামী মারা গেছেন ২৩ বছর আগে। এরপরও পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে তিনি পান চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, “সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন পান চাষে আগের মতো লাভ নেই। নতুন করে ৩০ শতক জমিতে পান বরজ করতে প্রায় ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতি মাসেই সার ও ওষুধ দিতে হয়।”

আরও পড়ুন: পরিচ্ছন্ন নগর গঠনে গফরগাঁও পৌরসভায় ৪৫ ডাস্টবিন স্থাপন

তিনি জানান, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বরজ থেকে পান কিনে নিয়ে যান। সাধারণ সময়ে ৮০টি পান নিয়ে এক বিড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও ফাল্গুন-চৈত্র মাসে ভালো পান ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।

একই এলাকার পানচাষি শুন পাল (৬৮) বলেন, “এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। প্রায় ২০–২৫ বছর আগে আশপাশে প্রায় ২৫০টি পান বরজ ছিল। এখন হাতে গোনা ৩০–৩৫টি বরজ আছে।”

তিনি আরও বলেন, আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে পান কিনতেন। এখন দূরের ব্যবসায়ীরা না আসায় স্থানীয় কয়েকজন দোকানির কাছে পান বিক্রি করতে হয়। এতে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না।

তার ভাষ্য, লাভ কম হওয়ায় অনেক চাষি পান বরজ ভেঙে কাঠবাগান, শাক-সবজি চাষ কিংবা গরুর খামার করছেন। সরকারি সহযোগিতা না পাওয়া এবং রোগবালাই দেখা দিলে কৃষি অফিসের প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এ পেশায় থাকতে আগ্রহী নয়।

উত্তর চান্দলার পান ব্যবসায়ী উত্তম কুমার বলেন, “একসময় চান্দলা ও মাধবপুর এলাকার পান দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। এখন বরজের সংখ্যা কমে গেছে। দূরের ব্যবসায়ীরা না আসায় বাজারও সংকুচিত হয়েছে। এতে চাষিরা পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।”

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, একই জমিতে বারবার পান চাষ করলে ফলন কমে যেতে পারে। জমি পরিবর্তন করে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। ভালো লতা বা চারা না পাওয়াও পান চাষে ফলন কম হওয়ার একটি কারণ।

তিনি বলেন, বর্তমানে উপজেলায় কতটুকু জমিতে পান চাষ হচ্ছে তার নির্দিষ্ট হিসাব কৃষি অফিসে নেই। তবে কোনো চাষি কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন।

চাষিদের দাবি, পান চাষকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি প্রণোদনা, রোগবালাই দমনে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ, উন্নত জাতের পানগাছ ও চারা সরবরাহ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তা না হলে ব্রাহ্মণপাড়ার ঐতিহ্যবাহী পান চাষ অচিরেই বিলুপ্তির পথে চলে যেতে পারে।