‘মাঠে এর প্রতিফলন থাকা চাই’—ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩১ অপরাহ্ন, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ডেঙ্গুর ভয়াবহ ছোবলে যখন একের পর এক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, তখন রোগ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি দপ্তরের সিদ্ধান্ত যেন কাগজে-কলমে আটকে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—‘মাঠে এর প্রতিফলন থাকা চাই।’ একই সঙ্গে বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে সারাদেশে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক অভিযান জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার দিনই ডেঙ্গুর ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৫৮ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৭ জনে।

আরও পড়ুন: ঢাকার যানজট নিরসনে ৪ টার্মিনাল দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

২৪ ঘণ্টায় ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ১,৫৫৮

আরও পড়ুন: পরিবেশ সুরক্ষায় চিনিশিল্প কারখানায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং আখ রোপণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন আরও একজন।

একই সময়ে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে—৩৩৪ জন। ঢাকা বিভাগে ৩১৬, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৯৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৮, বরিশাল বিভাগে ১৩৭, রাজশাহী বিভাগে ১১২, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৪, রংপুর বিভাগে ৫৬ এবং সিলেট বিভাগে ৯ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে রোববার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগেই মারা গেছেন ৬২ জন। খুলনা বিভাগে ১৯, ময়মনসিংহে ১২, বরিশালে ১০, চট্টগ্রামে ৮, রাজশাহীতে ৪ এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।

‘শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর নয়’

রোববার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে সারাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি না হওয়ার বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব কেবল সিটি করপোরেশন বা সরকারি কোনো একটি সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

‘মাঠে এর প্রতিফলন থাকা চাই’

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে সেগুলোর কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এ কারণে বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব বলেন, বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মাঠে এর প্রতিফলন থাকা চাই।’

অর্থাৎ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সভা, নির্দেশনা কিংবা সচেতনতামূলক বক্তব্য নয়—মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান সরকারপ্রধান।

মাঠে নামবে স্বেচ্ছাসেবকরা

পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্টের কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

স্থানীয় পর্যায়ে এসব সংগঠনের কর্মীদের মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কারণ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুধু হাসপাতাল বাড়ানো বা রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো না গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

উপজেলা হাসপাতালেও সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশ

বৈঠকে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবহারের জন্য মশারি সরবরাহের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশার মাধ্যমে যাতে অন্যদের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে ঝুঁকি কমাতেই হাসপাতালে মশারি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাড়তে পারে প্রকোপ

এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এ এম এ মুহিত বলেছেন, তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই অক্টোবরের আগেই সবাইকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

রোববার বিকেলে জাতীয় সংসদের টানেলে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আগের বছরের তুলনায় এ বছর এখনো ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কম। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সোমবার থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠপর্যায়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চালানো হবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে হাসপাতালসহ সব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে মশার প্রজননস্থলমুক্ত রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন।

প্রতিরোধে এখনই কঠোর হওয়ার তাগিদ

ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতিতে সামনে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। ফলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে সামনে রেখে এখনই মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত ও ধ্বংস করার কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

একদিকে হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ, অন্যদিকে বাড়ছে মৃত্যুও। এমন পরিস্থিতিতে শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রধানমন্ত্রীর ‘মাঠে এর প্রতিফলন থাকা চাই’ নির্দেশনাটি এখন বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে ডেঙ্গুর বিস্তার কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।