চবি ও হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্ভাবন ‘FarmNexa’: স্মার্ট কৃষিতে নতুন মাইলফলক

Sanchoy Biswas
মো. সাবিত বিন নাছিম, চবি
প্রকাশিত: ৯:৪৭ অপরাহ্ন, ১৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৬:১২ অপরাহ্ন, ২০ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কৃষিতে সারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে ‘FarmNexa’ নামে একটি স্বল্পমূল্যের স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ গবেষক।

গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (B.Sc. Ag (Honors), M.S. in Plant Pathology, PhD)। গবেষণা দলে রয়েছেন তাসিন হোসেন নাবিলসহ আরও কয়েকজন গবেষক। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং পরিবেশবিষয়ক সংগঠন Greenish World–এর প্রতিষ্ঠাতা সৈকত চক্রবর্তী প্রকল্পটির উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত হন।

আরও পড়ুন: ঢাবিতে ২০ লাখ টাকার দুটি ট্রাস্ট ফান্ড প্রতিষ্ঠা, বৃত্তি ও গবেষণায় সহায়তা পাবেন শিক্ষার্থীরা

গবেষকরা জানান, বাংলাদেশের কৃষি এখনো রাসায়নিক সারের আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। দেশে ব্যবহৃত পটাশ (MoP)-এর প্রায় ১০০ শতাংশ, ট্রিপল সুপার ফসফেট (TSP)-এর প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং ইউরিয়ার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা কিংবা বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব সরাসরি দেশের কৃষি খাতে পড়ে।

অন্যদিকে, নিয়মিত মাটি পরীক্ষার সুযোগ ও ব্যয় সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করেন। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা কমে যায়, জলাশয়ে পুষ্টি উপাদানের দূষণ বৃদ্ধি পায় এবং নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) নির্গমন বাড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও তীব্র করে।

আরও পড়ুন: অধ্যাপক কাবেরী গায়েনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে ঢাবি প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি

এই বাস্তবতা বিবেচনায় তৈরি করা হচ্ছে FarmNexa—একটি ইন্টারনেট অব থিংস (IoT)-ভিত্তিক স্মার্ট ক্রপ রেকমেন্ডেশন ও মাটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।

প্রযুক্তিটিতে ব্যবহৃত হয়েছে একটি ৭-ইন-১ স্মার্ট সয়েল সেন্সর, যা মাটির নাইট্রোজেন (N), ফসফরাস (P), পটাশিয়াম (K), পিএইচ (pH), আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং ইলেকট্রিক্যাল কন্ডাক্টিভিটি (EC) তাৎক্ষণিকভাবে পরিমাপ করতে পারে। সেন্সর থেকে সংগৃহীত তথ্য ESP32 ও GSM প্রযুক্তির মাধ্যমে ThingsBoard ক্লাউডে পাঠানো হয়।

এরপর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (SRDI)-এর সুপারিশকৃত তথ্যের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে কৃষকদের জন্য বাংলায় সহজ ভাষায় সার ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে, সিস্টেমটি জানাতে পারে—“নাইট্রোজেনের ঘাটতি রয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে ইউরিয়া প্রয়োগ করুন।”

এ ছাড়া কৃষকরা মোবাইল ড্যাশবোর্ড ও এসএমএসের মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে তাঁদের জমির মাটির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

গবেষক দলের দাবি, FarmNexa ব্যবহারের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ কমবে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, ফলন বৃদ্ধি পাবে এবং মাটির স্বাস্থ্য ও জলজ পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রযুক্তিটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

তাঁদের মতে, FarmNexa জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর মধ্যে SDG 2 (ক্ষুধামুক্ত ও টেকসই কৃষি), SDG 8 (শোভন কর্মসংস্থান), SDG 12 (দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন), SDG 13 (জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা), SDG 14 (জলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ) এবং SDG 15 (স্থলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকদের আশা, FarmNexa বাংলাদেশের কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারকে আরও বিস্তৃত করবে এবং কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর, সহজলভ্য ও পরিবেশবান্ধব স্মার্ট কৃষি সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।