বলিউডে অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিংয়ে বাড়ছে নিরাপত্তা

Shahrier Islam Pallab
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:৪৮ অপরাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৪৭ অপরাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
‘গেহরেইয়া’ সিনেমায় সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী ও দীপিকা পাড়ুকোন। ছবিঃ সংগৃহীত
‘গেহরেইয়া’ সিনেমায় সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী ও দীপিকা পাড়ুকোন। ছবিঃ সংগৃহীত

সিনেমায় অন্তরঙ্গ দৃশ্যের উপস্থাপন নিয়ে বরাবরই আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। কখনো সেন্সর বোর্ডের আপত্তি, কখনো মুক্তির পর দর্শকদের বিতর্ক—সব মিলিয়ে এ ধরনের দৃশ্য ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই। তবে পর্দায় দৃশ্যটি দেখানোর আগে শুটিং সেটে অভিনয়শিল্পীদের অভিজ্ঞতা কেমন, তা নিয়েও এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে চলচ্চিত্রশিল্প। বলিউডে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ধারণের সময় অভিনয়শিল্পীদের সম্মতি, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্রমেই বাড়ছে ‘ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর’ বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য সমন্বয়কদের ভূমিকা। 

একসময় এ ধরনের দৃশ্যের শুটিং অনেকটাই নির্ভর করত পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা কিংবা নিরাপত্তার সুস্পষ্ট নিয়ম না থাকায় কখনো কখনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখেও পড়তে হতো অভিনয়শিল্পীদের। তবে সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে সেই চিত্র। এখন ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে শুটিংয়ের প্রতিটি ধাপে অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত সীমারেখাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

আরও পড়ুন: নতুন রূপে সাই পল্লবী

যেভাবে বদলাচ্ছে শুটিংয়ের ধরন

বিশ্বজুড়ে বিনোদনশিল্পে যৌন হয়রানি নিয়ে মিটু আন্দোলনের পর চলচ্চিত্রের কর্মপরিবেশ এবং অভিনয়শিল্পীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এর প্রভাব পড়ে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ধারণের পদ্ধতিতেও। পশ্চিমা চলচ্চিত্রশিল্পে আগে থেকে প্রচলিত হতে শুরু করা ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের চর্চা ধীরে ধীরে ভারতীয় বিনোদনজগতেও বিস্তৃত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ক্যাম্পাস কনসার্ট প্রতিযোগিতার আয়োজনে কোক স্টুডিও বাংলা

ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটররা মূলত ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিকল্পনা করেন এবং পরিচালক ও অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করেন। কোন দৃশ্যে কী ধরনের শারীরিক সংস্পর্শ থাকবে, অভিনয়শিল্পীরা কোনটিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন এবং কীভাবে দৃশ্যটি নিরাপদে ধারণ করা সম্ভব—এসব বিষয় নিয়ে তাঁরা কাজ করেন।

বলিউডের এই পেশাজীবীদের মধ্যে পরিচিত নাম আস্থা খান্না। তার মতে, মারামারির দৃশ্য ধারণের আগে যেমন স্টান্ট পরিচালকের মাধ্যমে প্রতিটি পদক্ষেপ পরিকল্পনা করা হয়, তেমনি অন্তরঙ্গ দৃশ্যের ক্ষেত্রেও আগে থেকে সবকিছু নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

আস্থা খান্না বলেন, ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করার সময় হাত কোথায় থাকবে, চুল কীভাবে সাজানো হবে কিংবা শারীরিক সংস্পর্শের ধরন কেমন হবে—এসব বিষয় আগেই ঠিক করে রাখা হয়। এতে শুটিং চলাকালে হঠাৎ করে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমে।

নিরাপত্তায় ব্যবহৃত হচ্ছে বিশেষ উপকরণ

অন্তরঙ্গ দৃশ্য ধারণের সময় অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও শারীরিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের বিশেষ উপকরণ। এগুলো ‘মডেস্টি টুলস’ নামে পরিচিত। এসব উপকরণের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক সংস্পর্শ কমিয়ে দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব হয়।

এসব উপকরণের মধ্যে রয়েছে শরীরের সংবেদনশীল অংশ ঢেকে রাখার বিশেষ পোশাক বা সুরক্ষাবস্তু, স্তনবৃন্ত ঢাকার প্যাচ এবং দুই অভিনয়শিল্পীর মধ্যে সরাসরি সংস্পর্শ সীমিত রাখতে ব্যবহৃত বিশেষ কুশন। দৃশ্যের ধরন অনুযায়ী এসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়।

ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরদের কাজ শুধু শুটিংয়ের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়, বরং চিত্রনাট্যের পর্যায় থেকেই অভিনয়শিল্পীদের প্রস্তুত হতে সহায়তা করা। আস্থা খান্নার মতে, অভিনয়শিল্পীদের নির্বাচনের সময়ই চিত্রনাট্যে অন্তরঙ্গ দৃশ্য থাকার বিষয়টি জানানো উচিত। এতে চুক্তিতে সই করার আগেই তাঁরা দৃশ্যগুলোতে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রভাব

ভারতীয় চলচ্চিত্রে অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিংয়ের পদ্ধতি বদলে যাওয়ার পেছনে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ওটিটি কনটেন্টে সম্পর্ক, যৌনতা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক আগের তুলনায় বেশি বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে এসব দৃশ্যের পরিকল্পনা ও নির্মাণে পেশাদার সহায়তার প্রয়োজনও বেড়েছে।

একসময় বলিউডের মূলধারার সিনেমায় চুম্বন কিংবা যৌনসম্পর্কের দৃশ্য সরাসরি দেখানোর পরিবর্তে প্রতীকী উপস্থাপনার আশ্রয় নেওয়া হতো। ফুলের স্পর্শ, ঢেউয়ের সংঘর্ষ কিংবা আগুনের শিখার মতো দৃশ্যের মাধ্যমে বোঝানো হতো ভালোবাসা ও শারীরিক আকর্ষণ। এর পেছনে ছিল সেন্সরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ ও সামাজিক রক্ষণশীলতার প্রভাব।

তবে সময়ের সঙ্গে গল্প বলার ধরন বদলেছে। বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সম্পর্কের জটিলতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক তুলে ধরার সুযোগ বেড়েছে। এর ফলে অন্তরঙ্গ দৃশ্যের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় পেশাগত দক্ষতার গুরুত্বও সামনে এসেছে।

মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে এ ধরনের পেশাগত চর্চার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গেহরাইয়াঁ’। করণ জোহরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত সিনেমাটি অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পায়। ছবিটিতে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন আস্থা খান্না। তিনি অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ এবং ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিকল্পনায় সহায়তা করেন। পাশাপাশি ইনটিমেসি কোচ নেহা ব্যাসো শারীরিক সম্পর্কের দৃশ্যের গতিবিধি ও সম্মতি নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেন।

এরপর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্য নির্মিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও সিরিজে এ ধরনের পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে।

‘ট্যাবু’ ভাঙছে, গুরুত্ব পাচ্ছে সম্মতি

অপরাধনির্ভর জনপ্রিয় সিরিজ ‘মির্জাপুর’-এ স্পষ্ট ও খোলামেলা দৃশ্যের উপস্থিতি রয়েছে। তবে সিরিজটির প্রথম দিকের মৌসুমগুলোতে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর ছিলেন না। সিরিজটির অভিনয়শিল্পী রসিকা দুগ্গাল মনে করেন, এ ধরনের পেশাজীবীদের উপস্থিতি অভিনয়শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রসিকার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুর দিকে প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীকে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগত সীমারেখা সামলাতে হতো। কিন্তু ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর থাকলে কারও সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না এবং প্রত্যেকের উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সহজ হয়।

অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিংয়ে সম্মতির বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আস্থা খান্না জানান, অতীতে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে কোনো অভিনেতা তাঁর সহ-অভিনেত্রীর সম্মতি ছাড়াই তাঁকে চুম্বন করেছেন। তাঁর মতে, আগে থেকে দৃশ্যের প্রতিটি ধাপ নির্ধারণ করা থাকলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।

এখনো সীমিত পরিসরে এই পেশা

পরিবর্তনের ধারা শুরু হলেও ভারতের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনশিল্পে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের সংখ্যা এখনো সীমিত। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই শিল্পমাধ্যম মিলিয়ে এ ধরনের পেশাজীবীর সংখ্যা এক ডজনের কিছু বেশি।

বড় বাজেটের অনেক বাণিজ্যিক সিনেমায় এখনো তাঁদের সম্পৃক্ততা দেখা যায় না। এর একটি কারণ, কিছু অভিনয়শিল্পী পর্দায় শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা চুম্বনের দৃশ্যে অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। আবার কিছু নির্মাতা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ না করেই নিজেরা এসব দৃশ্য পরিচালনা করেন।

এ ছাড়া ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের বিষয়ে ভারতে এখনো সর্বজনীন কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা নেই। ফলে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এ বিষয়ে অভিন্ন নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।

শুধু রোমান্টিক দৃশ্য নয়

ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব শুধু রোমান্টিক কিংবা যৌন দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নগ্নতা, হয়রানি, আধিপত্য বিস্তার ও সহিংসতার মতো সংবেদনশীল বিষয়ও তাঁদের কাজের আওতায় আসতে পারে। এসব দৃশ্য ধারণের সময় অভিনয়শিল্পীদের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়।

আস্থা খান্নার মতে, ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিসর অনেক বিস্তৃত। পর্দায় কোনো দৃশ্য বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরতে গিয়ে যেন অভিনয়শিল্পীদের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়, সেটিই তাঁদের কাজের অন্যতম লক্ষ্য।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুটিং সেটে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও সুরক্ষাব্যবস্থা থাকলে অভিনয়শিল্পীদের এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়, যার মানসিক প্রভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলিউডে অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিংয়ে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি চলচ্চিত্র নির্মাণের কর্মপরিবেশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পর্দায় গল্পের প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য থাকলেও সেটে অভিনয়শিল্পীদের সম্মতি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সূত্র: এএফপি