লাগাম টানা যাচ্ছে না হামের, মৃত্যু হাজার ছাড়ালো

Sanchoy Biswas
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ৫:২২ পূর্বাহ্ন, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৫:৪০ পূর্বাহ্ন, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ বিবিসি বাংলা
ছবিঃ বিবিসি বাংলা

হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তবে দুটি ডোজ টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু এবার বাংলাদেশে ঘটে গেল একেবারে উল্টো এক পরিস্থিতি। দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার প্রায় ছয় মাস হলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রতিদিনই বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বর্তমানে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। দেশের ৬৪ জেলাতেই হাম ছড়িয়েছে। একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। যে হাম ভুলে যাওয়া অসুখে পরিণত হয়েছিল, তা গতকাল হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত দেশে  হামে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের অতিরিক্ত ভিড়, টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং অসুস্থ শিশুদের ক্রমবর্ধমান হাম আক্রান্তে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার বাংলাদেশের ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলাকালীন ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও এই দীর্ঘমেয়াদী প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে হামের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দেওয়ার কাজে চরম অবহেলাকে এর পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। দেশের ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে ঘটেনি। প্রায় ৮ বছর ধরে মৃত্যু তো দূরে থাক, হামে সংক্রমণের সংখ্যা ৪০০-এর বেশি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। আর এ বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার একেবারে উল্টো হয়ে গেল পরিস্থিতি। গতকাল ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে উপসর্গ নিয়ে তিন জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংক্রামক ভাইরাসজনিত এই রোগ ও এর উপসর্গে এই তিন জন নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়াল। এ সময়ের মধ্যে ৬৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে, নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং হাম উপসর্গ নিয়ে ৯০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সে হিসেব হিসেবে এক হাজার ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুজন মারা গেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৪০৪ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৫৬ জন। তারপর রাজশাহীতে ৯২, চট্টগ্রামে ৬৫, বরিশালে ৫৭, ময়মনসিংহে ৭৭, খুলনায় ৩৭ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গেল ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ১১৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩৪ জন। এ নিয়ে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা দাঁড়াল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন হাসপাতাল ছেড়েছে। দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০। আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯০৪।

আরও পড়ুন: হামজনিত শিশুমৃত্যু হাজার ছাড়াল

চলতি বছরের শুরু থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সে বিষয়ে নজর দেওয়া হয়নি। গত মার্চ থেকে হাম ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে চলে গণটিকাদান। কিন্তু সে সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে টিকাদানে ঘাটতি ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে দেশে হাম রোগের ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে। দেখা দিয়েছে শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট। একই সঙ্গে প্রতিদিনই হাম আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে আসার সংখ্যা বাড়ছে। এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের পর থেকেই শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার পেছনে দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং টিকা সংগ্রহের নীতিতে পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গত সোমবার সংসদে তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করা এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করার ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কথা জানিয়েছে। প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। 

এবার দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের গণহারে টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি চলে ২০ মে পর্যন্ত। কর্মসূচি শুরুর সময় সরকার সারাদেশে অন্তত এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিল ও মে মাসের ক্যাম্পেইনে প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে টিকার কাভারেজ হয়েছে শতভাগেরও বেশি। তবে শুরু থেকেই এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এর একটি বড় কারণ, একই বয়সী শিশুদের নিয়ে জুনে হওয়া ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ কর্মসূচির তথ্য। সেখানে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হয়। ফলে হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

আরও পড়ুন: হামের উপসর্গে আরও ৩ জনের মৃত্যু, মোট মৃত ৯৯৭

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে টিকাদান শুরু করা ঠিক ছিল। কিন্তু এরপর তৃণমূলের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা ও টিকার অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া এবং পরিস্থিতি শুরুতেই যথাযথভাবে স্বীকার না করা। হাম নিয়ন্ত্রণে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। এই মাত্রায় টিকাদান না হলে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো কঠিন।

হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের চিকিৎসা সময়মতো শুরু করা যাচ্ছে না, তাদের মধ্যেই মৃত্যুর হার বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের মধ্যে অনেক সময় জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, বাইরে থেকে আসা কিছু রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের কেউ কেউ মারা যাচ্ছে। আজিমপুরের বাসিন্দা আক্তার হোসেনের তিন মাস বয়সী মেয়ে ফাতিমা জান্নাত কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। পরে সারা শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু নয়, শিশুটির হাম হয়েছে। 

রোগতত্ত্ববিদ ও জাতীয় হাম-রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে হাম সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যে সংক্রমণ রয়েছে। ছয় থেকে ৯ মাস, ৯ মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর সব বয়সী শিশুর মধ্যে হাম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি। কোথাও কোথাও সংক্রমণ কিছুটা কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ঘোষিত টিকাদান কাভারেজ বাস্তবে কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সরকারের ১০৩ শতাংশ কাভারেজের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তার মতে, লক্ষ্য নির্ধারণেই অসংগতি থাকলে কাভারেজের হিসাবও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এখন প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ। কোন এলাকায় এবং কোন বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে সেই এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। মাহমুদুর রহমানের অভিযোগ, হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, অতীতে কোনো ক্যাম্পেইনের পর সংক্রমণ দ্রুত কমে যেত। এবার তা হচ্ছে না। আলোচনা নেই, বিশেষ ব্যবস্থা নেই, শুধু সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শুরু থেকেই তারা হামকে মহামারি ঘোষণা বা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারির কথা বলে আসছিলেন। এমন ঘোষণা দেওয়া হলে সব দিক থেকে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো। একসঙ্গে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হাম এত দীর্ঘায়িত হতো না। গত সোমবার সংসদে বিরোধীদলীয় এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং এর পরবর্তী জটিলতার কথা তুলে ধরেন। দেশ দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফ ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনগ্যাভির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর তৎকালীন প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, জরুরি জীবন রক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি উপযুক্ত নয়। এতে টিকার সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এ বিষয়ে ইউনিসেফ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয় এবং প্রায় ১০টি বৈঠকে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে। তবে সেই সতর্কবার্তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।

নতুন দরপত্র পদ্ধতি চালুর পর ফাইল ও কাগজপত্রের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। আন্তর্জাতিক গুদামে টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও ঢাকা থেকে সময়মতো চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থ ছাড় না হওয়ায় টিকার চালান দেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাসে গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির জরুরি প্রয়োজনের দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া যায়নি বলে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকাদান কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে ২০২৫ সালে সরকারের পক্ষ থেকে একটি পরিপূরক হাম-রুবেলা বিশেষ ক্যাম্পেইন বাতিল করা হয়। এর ফলে নিয়মিত টিকাদানের আওতা কমে যায়। পরে দেশের শিশু এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিশেষজ্ঞরা মোটা দাগে হামের প্রকোপ না কমার দুটি কারণ বলেছেন। এগুলো হল-অনেক শিশুর টিকা না পাওয়া এবং হাম মোকাবিলায় ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকা না করা। হাম পরিস্থিতি এতদিন পর্যন্ত লম্বা হওয়া এবং মৃত্যু ঠেকাতে না পারার বিষয়ে তারা সরকারের অবহেলা দেখছেন। তারা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর এখন অ্যান্টিবডি যাচাই করা উচিত, আদতেই টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হল কিনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় মতো সঠিক সিদ্ধান্ত মাঠে বাস্তবায়ন করা গেলে হামের প্রকোপ এ পর্যায়ে আসত না।