নিরাপত্তা শঙ্কায় বাঙ্কারযুক্ত প্রাসাদে অবস্থান বদলাচ্ছেন সৌদি যুবরাজ
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ও বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন প্রাসাদের মধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করছেন। তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি দল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যুবরাজ তাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করেছেন। রিয়াদে একের পর এক হামলায় জনজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: টানা তৃতীয় দিন রিয়াদ লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, প্রতিহতের দাবি সৌদির
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুবরাজের সর্বশেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি ছিল মঙ্গলবার। ওই দিন একটি জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি রক্তদান করেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে অন্তত ১২ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হন। আহতদের অনেকের অবস্থা গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলায় বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়ে।
আরও পড়ুন: যন্তর মন্তরের গেট টপকে ঢুকে আটক সিজেপির দুই মুখপাত্র
নিহতদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালাও ছিলেন। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় তাঁর একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।
রোববারও হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকার সময় সেখানে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র বা এর কোনো অংশ আঘাত হানে। এতে টার্মিনাল-৪-এ আগুন ধরে যায় এবং কয়েকজন আহত হন।
ক্রমাগত হামলায় রিয়াদের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হচ্ছে। শহরের আর্থিক অঞ্চলে কর্মরত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্কুলের শিক্ষার্থী ও কূটনীতিকদেরও ভবন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে অথবা আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আকাশে প্রতিহত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি কিন্ডারগার্টেন ও চিকিৎসাকেন্দ্রের কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। এতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বেসামরিক স্থাপনাগুলো ঝুঁকির বাইরে থাকছে না বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত কমে আসা নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার আশঙ্কা থাকায় রাজপ্রাসাদ ও জ্বালানি অবকাঠামোর মতো কৌশলগত স্থানের নিরাপত্তায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পর্যটন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিওমের মতো ভবিষ্যৎনির্ভর নগর প্রকল্প এবং রিয়াদে বেশ কয়েকটি বড় উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনেও হামলা চালিয়েছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি করতে পারে দেশটি। পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুতিদের হুমকি সৌদি আরবের বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় একটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। হামলার কারণে আন্তর্জাতিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে সৌদি আরবে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। এ ছাড়া দেশটির কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে অথবা পুনর্মূল্যায়নের আওতায় এসেছে। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাসের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
হুতি বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় সৌদি আরবকে সামরিক ও কূটনৈতিক—উভয় দিক থেকেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপদেষ্টা দিলেও ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধারে সরাসরি সহায়তার সৌদি অনুরোধে এখনো সাড়া দেয়নি ওয়াশিংটন।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহান্তে বলেছেন, হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ চলছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় করে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে হামলায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। বিমানবন্দরে হামলার পর ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যা করেছে, তা খুবই খারাপ।’
এদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছেও সহায়তা চেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সংঘাত নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথও খতিয়ে দেখছে দেশটি।
সব মিলিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা সৌদি আরবের রাজধানীর নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বেসামরিক স্থাপনায় ধ্বংসাবশেষের আঘাত এবং যুবরাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের খবর আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি ধরে রাখার প্রচেষ্টাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সূত্র: ওয়াইনেট, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।





