লালমনিরহাটে  শতাধিক ভক্তের অংশগ্রহণ, প্রার্থনা ও তর্পণে মুখর নদীপাড়

মহালয়ায় ধরলার তীরে পূর্বপুরুষদের স্মরণে ‘পিতৃ দর্পণ’

Shahrier Islam Pallab
মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিক লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৫:২৮ অপরাহ্ন, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:৩১ পূর্বাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মহালয়ার ভোর। ধরলা নদীর তীরে এক আবেগঘন পরিবেশ। কেউ এসেছেন প্রয়াত বাবা-মাকে স্মরণ করতে, কেউ দাদা-দাদি, নানা-নানি ও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। ধর্মীয় বিশ্বাস, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে নদীপাড়ে সমবেত হন লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার শতাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভক্ত। প্রার্থনা, তর্পণ ও পূর্বপুরুষদের স্মরণের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ‘পিতৃ দর্পণ’ অনুষ্ঠান।

শনিবার (১০ অক্টোবর) ভোরে ধরলা নদীর তীরে এ ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহালয়া যেমন শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনাকে ঘিরে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। সেই ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিরায়ত ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতিবছরের মতো এবারও ‘পিতৃ দর্পণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে লালমনিরহাটের শ্রীশ্রী গৌরীশঙ্কর গোশালা সোসাইটি।

আরও পড়ুন: মোহনগঞ্জে পুকুরে ডুবে একই বাড়ির দুই শিশুর মৃত্যু

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ভক্তরা ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করেন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা ও তর্পণ করেন। এ সময় নদীর তীরে তৈরি হয় শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণ ও আত্মিক অনুভূতির এক পরিবেশ। দুই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভক্তদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক ঐতিহ্যের এক মিলনমেলা।

পূর্বপুরুষদের স্মরণে আবেগ ও শ্রদ্ধা

আরও পড়ুন: কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে শয্যা হবে এক হাজার: কৃষিমন্ত্রী

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া জ্যোতিষ চন্দ্র রায় (৬৫) বলেন, মানুষের জীবনে পূর্বপুরুষদের অবদান গভীর ও বহুমাত্রিক। তাঁদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে পরিবার, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয় ঐতিহ্য, সংস্কার ও মূল্যবোধ। জীবদ্দশায় যাঁরা পরিবারের সদস্যদের আগলে রেখেছেন, মৃত্যুর পরও তাঁদের স্মরণ ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন উত্তরসূরিরা।

তিনি বলেন, “ধরলা নদীর তীরে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রয়াত পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহসহ পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার এর সুযোগ পাই। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি এমন আয়োজন মানুষের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন, আত্মিক সম্পর্ক ও শিকড়ের প্রতি টান আরও গভীর করে।

জীবন কুমার রায় (৪৪) বলেন, পূর্বপুরুষদের স্মরণ অনেকের কাছে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও মাধ্যম। সময়ের ব্যবধানে তাঁদের অনুপস্থিতি মেনে নিতে হলেও স্মৃতি, পারিবারিক শিক্ষা ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে তাঁদের অবদান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বেঁচে থাকে।

তাঁর মতে, এ ধরনের আয়োজন মানুষকে পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের অবদান স্মরণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে শিকড়ের পরিচয় তুলে ধরতেও ভূমিকা রাখে।

ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি সম্প্রীতির বার্তা

সুবল চন্দ্র রায় (৬৫) বলেন, ধরলা নদীর তীরে ‘পিতৃ দর্পণ’ অনুষ্ঠানে ভক্তদের অংশগ্রহণ পূর্বপুরুষদের স্মরণের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসে। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি এ ধরনের আয়োজন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি, সামাজিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির ক্ষেত্র তৈরি করে।

তিনি বলেন, “প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ, তাঁদের অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং পরিবারের শিকড়কে সম্মান জানানোর অনুভূতি মানুষের জীবনের গভীর একটি দিক। ধরলার তীরে মহালয়ার এই আয়োজন সেই চিরায়ত অনুভূতিরই প্রতিফলন।

মহালয়ার ধর্মীয় তাৎপর্য

শ্রীশ্রী কালীবাড়ী মন্দিরের পুরোহিত মঙ্কর চন্দ্র চক্রবর্তী জানান, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহালয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ সময় পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং দেবীপক্ষের সূচনা হয়। মহালয়াকে কেন্দ্র করে দেবী দুর্গার আগমনীর আবহ ছড়িয়ে পড়ে ভক্তদের মধ্যে। একই সঙ্গে পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা এবং তর্পণের রীতিও পালিত হয়।

তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলাচ্ছে। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যেও বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার মানুষের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। মহালয়ায় পূর্বপুরুষদের স্মরণ তেমনই একটি চর্চা, যা নতুন প্রজন্মকে পারিবারিক ইতিহাস, শিকড় ও ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

পুরোহিতের মতে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অতীতের স্মৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধকে ধারণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার আগ্রহও তৈরি হয়।

দুই জেলার ভক্তদের মিলনমেলা

শ্রীশ্রী গৌরীশঙ্কর গোশালা সোসাইটির সভাপতি হিরালাল রায় জানান, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের শতাধিক ভক্তের অংশগ্রহণে ‘পিতৃ দর্পণ’ অনুষ্ঠানটি দুই জেলার মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, নদীর তীরে ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা তাঁদের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ পান। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে পরিচিতি, পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। ভক্তদের অংশগ্রহণ এ আয়োজনের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব তুলে ধরে।

স্থানীয় জনজীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধরলা নদীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নদীকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, জনপদ ও নানা লোকাচার গড়ে উঠেছে। সেই নদীর তীরে মহালয়ার এই আয়োজন ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও পারিবারিক শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।

স্মৃতি ও শিকড়ের বন্ধনে ‘পিতৃ দর্পণ

মহালয়ার ভোরে ধরলার তীরে অনুষ্ঠিত ‘পিতৃ দর্পণ’ শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; অংশগ্রহণকারী ভক্তদের কাছে এটি প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করার উপলক্ষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশ্বাস ও রীতিনীতির ধারাবাহিকতায় এমন আয়োজন মানুষের অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র তৈরি করে।

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ভক্তদের অংশগ্রহণে ধরলা নদীর তীরে মহালয়ার এই আয়োজন ধর্মীয় অনুভূতি, পারিবারিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক আবেগঘন চিত্র তুলে ধরে। পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা তাঁদের শিকড়কে স্মরণ করেন এবং শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী আবহে মেতে ওঠেন নতুন প্রত্যাশায়।