মাইক্রোপ্লাস্টিক কি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি? যেভাবে খাবারের সঙ্গে শরীরে ঢুকছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা
খাদ্য ও পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্ল্যাসেন্টা এবং ধমনীতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। পানি, সামুদ্রিক মাছ, ফল, শাক-সবজি, লবণ, মধু, চা, চাল, মাংস এমনকি বাতাসেও মিলছে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট প্লাস্টিক কণা। এগুলোর একটি অংশ শিল্পকারখানায় এভাবেই তৈরি হয়, তবে অধিকাংশই প্লাস্টিকের বোতল, খাদ্য প্যাকেজিং, খাবারের পাত্র এবং সিন্থেটিক কাপড়ের মতো বড় প্লাস্টিকজাত পণ্য ধীরে ধীরে ভেঙে তৈরি হয়। এর চেয়েও ছোট ন্যানোপ্লাস্টিক খালি চোখে দেখা যায় না এবং এগুলো মানবদেহের গভীরে প্রবেশ করতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।
আরও পড়ুন: আজ বন্ধু দিবস: প্রিয় বন্ধুকে পাঠাতে পারেন হৃদয়ছোঁয়া শুভেচ্ছা বার্তা
যেভাবে খাবারে পৌঁছায় মাইক্রোপ্লাস্টিক
গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে। দূষিত মাটি, নদী ও সমুদ্রের পানি, প্লাস্টিকের খাদ্য প্যাকেজিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন এবং রান্না বা সংরক্ষণের সময় বাতাসে ভাসমান প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমেও এগুলো খাবারে মিশতে পারে।
আরও পড়ুন: বিকেলে ক্লান্ত লাগে? এনার্জি বাড়ানোর ৭টি প্রাকৃতিক উপায়
মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) জানিয়েছে, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। তবে কোনো খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেই তা মানুষের জন্য নিশ্চিতভাবে ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলক বড় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো ন্যানোপ্লাস্টিক, যা শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে প্রবেশ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া বাড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ ছাড়া গবেষণায় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা কোষ, প্রোটিন ও ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিছু পরীক্ষামূলক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, অনেক প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রাসায়নিক সংযোজনী এবং পরিবেশ থেকে শোষিত কীটনাশক বা ভারী ধাতুও মানবস্বাস্থ্যের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই একে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। তবে সংস্পর্শ কমানোর জন্য কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে—
- প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম না করে কাঁচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন।
- গরম খাবার ও পানীয়ের জন্য কাঁচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ও পাত্র ব্যবহার করুন।
- অতিরিক্ত গরম খাবার দীর্ঘ সময় প্লাস্টিকের পাত্রে রাখার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
- কিছু গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বোতলজাত পানির তুলনায় ফিল্টার করা কলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ কম থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।





