অর্থপাচারবিরোধী অভিযান বন্ধে তৎপর মাফিয়া চক্র
আর্থিক গোয়েন্দা প্রধান শাহীনুলকে বিতর্কিত করার চেষ্টা

বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত টাকা ও অবৈধ সম্পদ সনাক্ত ও পুনরুদ্ধার অভিযানের মধ্যে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রধান শাহীনুল ইসলামকে ঘিরে নানামুখী বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে মাফিয়া চক্র। দেশের আর্থিক গোয়েন্দা প্রধানকে বিতর্কিত করতে পারলে অভিযান অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে।
স্বৈরাচারী সরকারের ঘনিষ্ঠ এস আলম, ওরিয়ন গ্রুপ, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, সাবেক এমপি ইকবাল, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানসহ কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে দেশের ভিতরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে। ইতিমধ্যেই কয়েক দেশে পাচারের টাকায় গড়া ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ সনাক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটসহ আরও কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে কিছু পক্ষ: সালাহউদ্দিন
তদন্তে ফ্যাসিস্ট হাসিনাঘনিষ্ঠ অর্থপাচার চক্রটির তথ্য উঠে আসার পর এমন বিতর্ক অভিযান থামাতে চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পরিবারের জন্য নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে, যা পাচারকারীদের চক্রান্ত বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একটি চরম ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি ফেসবুক থেকে শাহীনুলের একটি পুরনো ছবি নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অশ্লীল রূপ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে বিপরীত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে, যিনি গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠেছে যে, অর্থপাচার চক্রের প্রভাবের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী নতিস্বীকার করবে, নাকি অহেতুক সমালোচনায় কান না দিয়ে শাহীনুলদের সাহস যোগাবে এবং পাচারকারীদের ছাড় দেবে না—কোন পথে যাবে কর্তৃপক্ষ?
আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ, সেনা মোতায়েন
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তাও বলছেন, এসব অভিযোগ বা সমালোচনা উদ্দেশ্যমূলক। এখানে শাহীনুলের কি দোষ?
সহকর্মীরা বলেন, যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা চাকরিক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘন বা অপরাধ সংশ্লিষ্ট নয়।
সাইবার অপরাধ গবেষণাকারী বেসরকারী সংগঠন সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছবিটি উদ্দেশ্যমূলক, চাকরির নীতিবিরোধী অপরাধ নয়।
সাইবার আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, ছবিটি ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ছড়ানো, যা সাইবার অপরাধ এবং আইন অনুযায়ী অজামিনযোগ্য।
বিএফআইইউ অর্থপাচার (মানি লন্ডারিং), সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিস্তার রোধে গঠিত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে এ বিভাগটি সন্দেহজনক ও নগদ লেনদেন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে। মূল লক্ষ্য—আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
বর্তমান গভর্নরের কিছু কাজের প্রতিবাদ করা ও একাধিক ডেপুটি গভর্নর বিএফআইইউ প্রধানের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিএফআইইউ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন নথি তলব করা হয়েছে, যারা সবাই অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের অনুগত ও সুবিধাভোগী অনেক কর্মকর্তা ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ওই সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের বড় অংশ শাহীনুল ইসলামের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর পর শাহীনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পরে দেশের পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে আমাকে অনেকের শত্রুতে পরিণত হতে হয়েছে। আমি অনেকের কোটি কোটি টাকা ফ্রিজ করেছি, মামলা করেছি। এতে প্রভাবশালীদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এখন তারা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করছে। আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের ষড়যন্ত্র চালিয়ে সুবিধা নিতে চায় একটি চক্র। আমি এসবে ভয় পাই না। দেশের মানুষের অর্থ ফেরাতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আবেগের কথা জানিয়ে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান। এর সুনাম রক্ষায় সবার সতর্ক থাকা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখালে প্রকৃত অপরাধী আড়ালে চলে যাবে।”
সূত্র জানায়, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ভিডিও নিয়ে বিতর্ক বিষয়টিকে পুরোটাই ষড়যন্ত্র। যারা এখন আন্দোলন করছে, তারাও বিশেষ গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহলেই মনে হচ্ছে। যেহেতু ঘটনার তদন্ত হচ্ছে, তাই তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত সবপক্ষকে অপেক্ষা করা জরুরি। একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে এভাবে অপবাদ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে কেউ ভালো কাজে উৎসাহী হবে না বলেও দাবী করেন ওই কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি এ এফ এম শাহীনুল ইসলাম বিএফআইইউর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি সংস্থার উপপ্রধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি দেশের আর্থিক খাতে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন, যা ইতিমধ্যেই প্রভাবশালী মহলের স্বার্থে আঘাত করেছে।