পাতাল বোমায় ঝুঁকির মুখে নগরবাসী

প্রতিনিয়ত মাটির নিচে পুঞ্জীভূত হচ্ছে লিকেজ গ্যাস

Sadek Ali
মোহাম্মদ রুবেল
প্রকাশিত: ১১:০৪ পূর্বাহ্ন, ৩০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৫:২৪ অপরাহ্ন, ৩০ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

* সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজে’২৫ সালে ৫৬২ এবং গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ৯২০টি দুর্ঘটনা, এতে নিহত হয়েছেন ৮৫ জন এবং আহত জন ২৬৭।

* ঢাকায় ৩০ শতাংশ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে, গ্যাস সরবরাহ লাইনের ৭০ শতাংশই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ-ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।

আরও পড়ুন: আগস্টের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

* সিলিন্ডার ও সরবনাহ লাইন লিকেজ থেকে ’২৪ সালে ৭০৪টি ও  ৪৬৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

শহর থেকে গ্রাম, পথে প্রান্তরের ভূগর্ভের নরম বিছানায় বিস্তৃত, অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ, লিকেজ গ্যাসের জরাজীর্ণ পাইপ লাইন। এর সঙ্গে স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায়ই নতুন করে ৩০ থেকে ৪০টি অবৈধ পাইপ লাইন যুক্ত হয়েছে। এসব পাইপ লাইনের মেয়াদ ৩০ বছর থাকলেও ১০ বছরের বেশি সময় ধরে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে সারাদেশে। শহরের গ্যাস সরবরাহ লাইনের প্রায় ৭০ শতাংশই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। রাজধানী ঢাকার প্রায় ৩০ শতাংশ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে গ্যাসের পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে। তিতাসের একেকটি পাইপ লাইন যেন মাটির নিচে পুতে রাখা পাতাল বোমার মরণফাঁদ। এ ফাঁদে প্রতিদিনই পুরো শহরটিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এক প্রলয়ঙ্করী অগ্নিকুণ্ডের গর্ভে। এ গর্ভের মারাত্মক বিস্ফোরণে প্রায়শই ঘটছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সম্পদ। এ বাস্তবতায় প্রতিনিয়ত মৃত্যুরফাঁদে ঢাকার বাসিন্দারা। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি সুনির্দিষ্ট গ্যাস লিকেজের অভিযোগ জমা পড়ে। কিন্তু তীব্র জনবল সংকট, লিক ডিটেকশন প্রযুক্তির অভাব এবং ঢাকার দুঃসহ যানজটের কারণে তিতাসের ইমার্জেন্সি টিম প্রতিদিন বড়জোর ১৫ থেকে ২০টি অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধান করতে পারে। এই বিশাল ব্যবধানের কারণে ঢাকার মাটির নিচে প্রতিনিয়ত ২০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস পুঞ্জীভূত হচ্ছে বা থেকে যাচ্ছে। এ জমাটবদ্ধ গ্যাস থেকে মাঝারি সিসমিক কম্পনে পুরো শহরকে একযোগে বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটানোর ক্ষমতা রাখে। সম্প্রতি প্রকাশিত বুয়েটের এক গবেষণায়ও একই চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে জরাজীর্ণ অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভূগর্ভস্থ গ্যাসলাইনের চরম অব্যবস্থাপনায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনবহুল এই মেগাসিটি এখন কার্যত সিসমিক টাইম-বোমায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, মাত্র ৭.৫ মাত্রার একটি সম্ভাব্য ভূমিকম্পেই শহরের মাটির গঠন ও দুর্বল ইউটিলিটি লাইনের কারণে ভয়াবহ কারিগরি বিপর্যয় ঘটতে পারে। মাটির নিচে পুঞ্জীভূত গ্যাসের কম্পনে একযোগে বিস্ফোরিত হয়ে পুরো নগরীর অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি এক প্রলয়ঙ্করী অগ্নিকুণ্ড তৈরি করবে, যা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।  

আরও পড়ুন: কোনো চক্রের প্রভাব না দেখে মানব পাচারকারীদের দমন করতে হবে: রিজভী

পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের ইতিহাস: ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে পাইপলাইনের সাহায্যে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ শুরু হয়। ঢাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ শুরু ১৯৬৭ সালের দিকে। এরপর দেশজুড়ে গ্যাসের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। সারাদেশে গ্যাস নেটওয়ার্কের পরিমাণ ২৪ হাজার ২৮৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিতরণ ও সার্ভিস লাইন প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার। ঢাকা বিভাগে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত তিতাস গ্যাসের ১২ হাজার ২৫৩ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৭ হাজার কিলোমিটার। ঢাকা ছাড়াওÑ নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর এবং কিশোরগঞ্জে তিতাসের পাইপলাইন আছে। এর মধ্যে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নরসিংদীতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের পরিমাণ বেশি। মূল লাইন থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাধারণ পাইপে বাসাবাড়ি ও কারখানায় গ্যাস নেওয়া হয়। এসব অনিরাপদ সংযোগ থেকে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া বিভিন্ন সময় রাস্তা সংস্কারের কারণে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। 

কেসস্টাডি ১- ঢাকার ধামরাইয়ের বিজয় নগর এলাকায় চলতি বছরের ১০ মার্চ গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। চা বানাতে ম্যাচ দিয়ে চুলা জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে আগুন ধরে যায়। গত ৬ মার্চ রাজধানীর উত্তরায় গ্যাসের পাইপলাইন লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের নারী-শিশুসহ ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। এতে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরের বাসায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী-শিশুসহ ৯ জন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন ভাই ও দুই স্ত্রীসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এমন একটি বা দুটি নয়, প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসলাইন কিংবা সিলিন্ডার লিকেজ ও বিস্ফোরণে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। এসব দুর্ঘটনায় শিশু ও নারীসহ অকালেই ঝরে পড়ছে অনেক প্রাণ। যারা বেঁচে থাকেন তাদেরকে আজীবনের জন্য বরণ করতে হয় পঙ্গুত্ব। এমন দুর্ঘটনায় কখনো করুণ মৃত্যু ঘটে একটি পরিবারের সব সদস্যের। এসব নিয়ে ভোক্তারা অভিযোগ করে বলেন, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে তিতাস কর্তৃপক্ষের অনীহা ও গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। ধানমন্ডির বাসিন্দা, এক সময়ের জাসদ নেতা আবু সুফিয়ান বাংলাবাজার পত্রিকার প্রতিবেদককে বলেন, তিতাস কর্তৃপক্ষ একবার লাইন বসানো ও সংযোগ দেওয়ার পর আর কখনো খোঁজ নিতে আসে না। অনেক সময় গ্রাহকরা তাদের সহায়তা চেয়ে না পেয়ে বাধ্য হয়ে আনাড়ি মিস্ত্রি দিয়ে মেরামতের কাজ করেন।  

কেসস্টাডি ২- গত ৯ জানুয়ারি নোঙরের আঘাতে তুরাগ নদের নিচে স্থাপিত গ্যাস পাইপলাইন লিকেজ হওয়ার পর মেরামতকালে পাইপে পানি ঢুকে পড়ায় রাজধানীবাসী তীব্র গ্যাসর  সংকট পড়ে। এ নিয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানায়, মালবাহী নৌযানের নোঙরের আঘাতে আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীর তলদেশে অবস্থিত বিতরণ গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাইপলাইন লিকেজের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে গাবতলী থেকে আসাদগেট, মোহাম্মদপুর, বসিলা, লালমাটিয়া, ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৬ বছরে সারা দেশে সংঘটিত দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ডের একটি বড় অংশই ছিল গ্যাস দুর্ঘটনা সংক্রান্ত। গত বছরে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজ থেকে ৫৬২টি এবং গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৯২০টি আগুনের ঘটনা ঘটে। আবাসিক ভবনে ঘটিত অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ৮৫ জন এবং আহত হন ২৬৭ জন। ২০২৪ সালে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ, বিস্ফোরণ ও লাইন লিকেজের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজে দুর্ঘটনা ৭০৪টি, সরবরাহ লাইনের লিকেজে অগ্নিকাণ্ড ৪৬৫টি এবং বিস্ফোরণের ঘটনা ৪৪টি। এতে ক্ষতি হয়েছে ৯১ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৪ টাকার। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, দুর্ঘটনার আগে গ্যাস লিকেজ বা ঘরে জমে থাকা গ্যাসের বিষয়টি তারা টের পাননি। রান্নার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে মুহূর্তের মধ্যে সবার শরীরে আগুন ধরে গেছে। ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্যনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আড়াই হাজারের বেশি দগ্ধ রোগী ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশ সিলিন্ডার ও গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার শিকার। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও অধিকাংশ দুর্ঘটনা মূলত লিকেজ থেকে ঘটে। নিম্নমানের হোসপাইপ, রেগুলেটর, নজল ও ভালভ ব্যবহারের কারণে লিকেজ সৃষ্টি হয়। এছাড়া ঘরে গ্যাসের গন্ধ তেমন টের না পাওয়ায় বাসিন্দারা সময়মতো সতর্ক হতে পারেন না। সাধারণ মানুষ সচেতন হলে অনেক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব। 

তিতাস নেটওয়ার্কের জরাজীর্ণ চিত্র ও সিসমিক ঝুঁকি: ঢাকা মহানগরীর ভূগর্ভস্থ ১ থেকে ৩ মিটার গভীরতায় তিতাস গ্যাসের প্রায় ১২,১৬০ কিলোমিটার বিস্ত‍ৃত পাইপলাইন রয়েছে। তবে আধুনিক জিআইএস ম্যাপিং প্রযুক্তির অনুপস্থিতিতে এই বিশাল নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও গভীরতা খোদ তিতাসের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছেও স্পষ্ট নয়। ফলে যেকোনো উন্নয়নমূলক খননকাজে প্রায়ই মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাস পাইপলাইনের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। মাটির নিচের অতিরিক্ত আর্দ্রতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ এবং অনবরত রাস্তা খননের ফলে এসব লাইন মারাত্মক জং ধরা ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া হাজার হাজার সূক্ষ্ম লিকেজ থেকে বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক এলাকায় প্রায়ই ঘটছে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও প্রাণহানি।

বুয়েট গবেষণায় আরও উঠে এসেছে: ঢাকার মাটির অবস্থাকে লিকুইফ্যাকশন পটেনশিয়াল ইনডেক্সের (এলপিআই) ভিত্তিতে চার রঙের জোনে বিভক্ত করেছে। এলপিআই ১৫-এর বেশি হলে তা লাল জোন বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, ১০ থেকে ১৫ হলে ম্যাজেন্টা জোন বা মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, ৫ থেকে ১০ হলে নীল জোন বা স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৫-এর নিচে হলে তা সবুজ জোন বা সর্বনিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্দেশ করে। এবিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকায় ভবন নির্মাণে স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে গত ডিসেম্বর (২০২৫) থেকে নতুন ভবন নির্মাণে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, গত ৫৫ বছরে ঝুঁকি মানচিত্রভুক্ত এলাকায় ঠিক কতসংখ্যক ভবন নির্মিত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা বর্তমানে রাজউকের কাছে নেই। সূত্রে জানা যায়, লাল জোন সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে- হযরতপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, তেঘরিয়া, কুণ্ডা, এনায়েতনগর, কাশীপুর, কলাগাছিয়া, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, বন্দর, মোগরাপাড়া, নারায়ণগঞ্জ সদর, বক্তাবলী, ডুমনি, বাড্ডা, আশুলিয়া, কাটাবলী ও দারুস সালাম, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও পাথালিয়ার কিছু অংশ এবং নিউ মার্কেট, লালবাগ ও মদনপুর এই জোনের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া ম্যাজেন্টা জোন মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে কোনাবাড়ী, ইয়ারপুর, ক্যান্টনমেন্ট, পল্লবী, গুলশান, রূপগঞ্জ, ভুলতা, খিলগাঁও, আদাবর, তেজগাঁও, রামপুরা, মতিঝিল, ডেমরা, সবুজবাগ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, কদম রসুল পৌরসভা, মুছাপুর, সাদীপুর, কাঁচপুর ও পল্টন, হরিরামপুর, বিরুলিয়া, বিভিন্ন পৌর এলাকা, কাফরুল, দক্ষিণখান, ফতুল্লা ও হাজারীবাগের কিছু অংশ এই জোনের অন্তর্ভুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও গভীর উদ্বেগ: গত মঙ্গলবার গ্যাস বিস্ফোরণ বিষয়ে বুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বাংলাবাজার পত্রিকার প্রতিবেদককে বলেন, ঢাকার ভূগর্ভস্থ মাটির স্থায়িত্ব ও গ্যাসলাইনের সিসমিক ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা। ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ নরম মাটির ওপর বিছানো তিতাসের পুরনো পাইপলাইনগুলো বড় কম্পন সহ্য করতে পারবে না। লাল জোন চিহ্নিত এলাকাগুলোতে মারাত্মক ভূমিধস ঘটতে পারে। ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রথম ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ঢাকার গ্যাস নেটওয়ার্কের প্রায় ১৭.৪ শতাংশ লাইন মাটির নিচে সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। তীব্র ভূমিকম্পে লাইন ফেটে গ্যাস নির্গত হলে পুরো রাজধানী জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হতে পারে। তবে তিনি এই ঝুঁকি মোকাবিলায় তিতাস গ্যাস নেটওয়ার্কে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় শাট-ডাউন সিস্টেম (ঊঊডঝ) স্থাপন করার পরমর্শ দেন। এই প্রযুক্তি মূল কম্পন আঘাত হানার ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ড আগেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেবে, যা ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় উত্তর-ভূমিকম্পকালীন অগ্নিকাণ্ড সম্পূর্ণ রোধ করতে সক্ষম হবে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন অভিযোগ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, ২০২৬ সালে এসেও ঢাকার ভূগর্ভস্থ গ্যাস নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন হয়নি। মাটির নিচে পুঞ্জীভূত গ্যাস ও অবৈধ সংযোগ থেকে নির্গত জ্বালানি যেকোনো ভূমিকম্পে বড় অগ্নিকাণ্ডের উৎস হিসেবে কাজ করবে। লিকেজ মেরামতের আড়ালে প্রতিনিয়ত অবৈধ সংযোগ স্থানান্তরের কারণে গ্যাসলাইনের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালের চলমান জ্বালানি সংকটের চেয়েও এই কাঠামোগত নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেক বেশি ভয়াবহ। এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক মুনাফার ঊর্ধ্বে উঠে তিতাসের সিসমিক ঝুঁকি হ্রাস এবং ৮,০৬৯ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নকে জাতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

গ্যাসলাইন নেটওয়ার্ক নিরাপদ করতে চার দফা জরুরি সুপারিশ বিশেষজ্ঞদের: ১. স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ ভালভ: ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা উত্তরা ও মিরপুরের প্রধান গ্যাস স্টেশনগুলোতে সিসমিক সেন্সরযুক্ত ভালভ বসাতে হবে, যা কম্পনমাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরবরাহ বন্ধ করবে। ২. এইচডিপিপি পাইপলাইন: ৩০-৪০ বছরের পুরনো জং ধরা লোহার পাইপ বদলে অত্যন্ত নমনীয় ও উচ্চ ঘনত্বের প্লাস্টিক (ঐউচঊ) পাইপ লাগাতে হবে, যা তীব্র ঝাঁকুনিতেও অক্ষত থাকে। ৩. ডিজিটাল ও থ্রি-ডি ম্যাপিং: জরুরি দুর্যোগে দ্রুত উদ্ধারকাজের সুবিধার্থে তিতাসের জন্য পুরো ভূগর্ভস্থ গ্যাস নেটওয়ার্কের একটি নিখুঁত ডিজিটাল ও থ্রিডি মানচিত্র তৈরি করা অপরিহার্য। ৪. আইন ও সুরক্ষার কড়াকড়ি: জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে গ্যাস সংযোগ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস লিক ডিটেক্টর ব্যবহার আইন করে কার্যকর করতে হবে।